‘আমি ফিরে এসেছি মানুষের জন্য’, সংসদে আবেগাপ্লুত মির্জা আব্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো যোগ দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে নিজের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, জীবনের বাকি সময়টুকু যেন দেশ ও জাতির জন্য কাজ করে যেতে পারেন।

 

বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে পৌঁছান মির্জা আব্বাস। পরে বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে তিনি অধিবেশনে যোগ দেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে হুইলচেয়ারে বসেই সংসদে অবস্থান করেন তিনি। অধিবেশন কক্ষে তার উপস্থিতি ঘোষণা করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম তাকে স্বাগত জানান। এ সময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান।

 

ট্রেজারি বেঞ্চের প্রথম সারিতে হুইলচেয়ারে বসেছিলেন মির্জা আব্বাস। স্পিকার তাকে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সংসদে ফিরে আসায় স্বাগত জানান। জবাবে ডান হাত কিছুটা তুলে সালাম জানান মির্জা আব্বাস। এ সময় তাকে হাত তুলতে সহযোগিতা করেন হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমানউল্লাহ আমান।

 

দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে এখনো তার হাতের স্বাভাবিক নড়াচড়া পুরোপুরি ফেরেনি। চিকিৎসকদের পরামর্শে তার ফিজিওথেরাপি চলছে। সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময়ও তিনি দাঁড়িয়ে নয়, হুইলচেয়ারে বসেই কথা বলেন। এ সময় আমানউল্লাহ আমানের আসনের মাইক্রোফোন ব্যবহার করেন তিনি এবং লিখিত বক্তব্য পড়তে তাকে সহযোগিতা করেন আমানউল্লাহ আমান।

 

বক্তব্যের শুরুতেই মির্জা আব্বাস স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ২০০৬ সালের পর আবার জাতীয় সংসদের এই কক্ষে কথা বলার সুযোগ পাওয়া তার রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত আবেগঘন ও স্মরণীয় একটি দিন।

 

মির্জা আব্বাস বলেন, বর্তমান সংসদের যাত্রা শুরুর পরপরই ১১ মার্চ তিনি গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর দীর্ঘ সময় সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসা এখনো শেষ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসার মাঝপথেই সংসদের প্রতি আবেগ, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে তিনি অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন।

 

তিনি বলেন, “আজ চিকিৎসা শেষ বললে ভুল হবে, আমার চিকিৎসা শেষ হয়নি। চিকিৎসার মাঝপথে প্রথমবারের মতো আমি সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত হতে পেরে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।”

 

অসুস্থতার সময়ে যারা তার জন্য দোয়া করেছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন এবং পাশে থেকেছেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। দলমত নির্বিশেষে যারা তার সুস্থতা কামনা করেছেন, তাদের ভালোবাসা ও শুভকামনার কথা স্মরণ করেন মির্জা আব্বাস।

 

অসুস্থতার সময়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি। এ জন্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান বিএনপির এই নেতা।

 

স্পিকারের প্রতিও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মির্জা আব্বাস। তিনি জানান, অসুস্থ অবস্থায় স্পিকার তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। সে সময় তিনি অচেতন থাকায় স্পিকারকে দেখতে পারেননি। পরে বিষয়টি জানতে পেরে তিনি আবেগাপ্লুত হন। স্পিকারের এই আচরণকে একজন অসুস্থ সংসদ সদস্যের প্রতি মানবিক সহমর্মিতার পাশাপাশি সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

 

জাতীয় সংসদে ফিরে রাজনীতির বৃহত্তর দায়িত্বের কথাও তুলে ধরেন মির্জা আব্বাস। তার ভাষায়, সংসদ শুধু বিতর্কের জায়গা নয়, এটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর জায়গা। তিনি নির্বাচনি এলাকার মানুষ এবং দেশের মানুষের জন্য দায়িত্ব পালন করে যেতে চান বলে জানান।

 

বক্তব্যে বিএনপির এই নেতা মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

 

নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে মির্জা আব্বাস বলেন, ২০০৬ সালের পর আবার জাতীয় সংসদে কথা বলার সুযোগ পাওয়া তার জন্য আনন্দ ও গর্বের বিষয়। দীর্ঘ বিরতির পর সংসদে ফিরে আসার অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমি ফিরে এসেছি মানুষের কাছে, মানুষের জন্য এবং বাংলাদেশের জন্য কাজ করার জন্য।”

 

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে মির্জা আব্বাস সবার কাছে দোয়া চান। তিনি বলেন, “আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি যে কয়দিন বেঁচে থাকি, যেন দেশ ও জাতির জন্য কাজ করে যেতে পারি।”

 

অসুস্থতার শুরু

 

১১ মার্চ ২০২৬ রাজধানীর শাহজাহানপুরের নিজ বাসায় ইফতারের সময় হঠাৎ জ্ঞান হারান মির্জা আব্বাস। পরে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন নিউরো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল টিম তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করে।

 

এরপর ১৫ মার্চ উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় এক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে ফিজিওথেরাপির জন্য ১৪ এপ্রিল মালয়েশিয়ার প্রিন্স কোর্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

 

সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সাড়ে পাঁচ মাস চিকিৎসা শেষে ২ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন মির্জা আব্বাস। দেশে ফেরার পরদিনই তিনি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেন।

 

সংসদে যোগ দেওয়ার আগে বৃহস্পতিবার সকালে নিজের কার্যালয়ে দাফতরিক কাজও শুরু করেন তিনি। সংসদ ভবনে পৌঁছালে দফতরের কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান। পরে নির্ধারিত অফিসে গিয়ে বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করেন এবং নতুন দায়িত্ব পালনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

 

ঢাকা-৮ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত মির্জা আব্বাস দীর্ঘ চিকিৎসার কারণে সংসদের কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নিতে পারেননি। চিকিৎসা পুরোপুরি শেষ না হলেও বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো অধিবেশনে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেন তিনি।