মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার স্বস্তির মাঝেও সিন্ডিকেট আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দীর্ঘ জটিলতা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন শেষে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার খবরে দেশের লাখো অভিবাসনেচ্ছুক কর্মী এবং জনশক্তি রফতানিকারকদের মাঝে নতুন করে স্বস্তি ফিরলেও, নিয়োগকারী ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বহুপ্রতীক্ষিত এই শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে না হতেই পুরোনো ‘সিন্ডিকেট’ প্রথা নতুন মোড়কে ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, গত ২৮ আগস্ট মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস (ঋডঈগঝ)-এ ৩৩৮টি বাংলাদেশি এজেন্সির তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়, যার মধ্যে ২৫টি প্রধান এজেন্সি, তাদের অধীনে ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের অধীনে ৬২টি এজেন্সিকে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এই তালিকার বড় একটি অংশজুড়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে কর্মী পাঠানোর ন্যূনতম অভিজ্ঞতা নেই এবং লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি একটি লোকও বিদেশে পাঠায়নি— এমন অখ্যাত রিক্রুটিং এজেন্সির নামও তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অবশ্য বিষয়টিকে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যে একটি ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ বলে অভিহিত করে জানিয়েছে যে, ২০২২ সালে বিগত সরকারের সময় স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের বাধ্যবাধকতার কারণেই এজেন্সি নির্বাচনের পুরো সিদ্ধান্ত মালয়েশিয়া সরকার একা গ্রহণ করেছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে কেন্দ্র করে অতীতে একাধিকবার বিশাল আর্থিক দুর্নীতি, অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং চক্র গড়ে ওঠার ইতিহাস রয়েছে, যা প্রতিবারই এই বড় শ্রমবাজারটির পতন ঘটিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ২০০৮ সালে প্রথম মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালে পুনরায় চালু হলেও সেখানে ১০টি নির্ধারিত এজেন্সির একটি বিশেষ চক্র বা সিন্ডিকেট তৈরি করে কর্মী পাঠানো হয়। সরকারিভাবে খরচ ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও ওই সময় কর্মীদের কাছ থেকে আড়াই থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যার আনুমানিক আর্থিক পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এরপর ২০১৮ সালে দুর্নীতি ও প্রতারণার অভিযোগে মালয়েশিয়া সরকার শ্রমিক নেওয়া পুরোপুরি স্থগিত করে দিলে টানা চার বছর বাজার বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ২০২২ সালের আগস্ট থেকে কর্মী যাওয়া শুরু হলেও আবারও প্রথমে ২৫টি এবং পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১০০টি এজেন্সির হাতেই পুরো বাজার বন্দি হয়ে পড়ে। উক্ত সময়ে সিন্ডিকেট ফি বাবদ প্রতি কর্মীর কাছ থেকে অতিরিক্ত দেড় লাখ টাকা আদায় করে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা এবং দেড় বছরে মোট ১৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাণিজ্য গড়ে তোলার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে, যেখানে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বিশেষ প্রভাবশালীদের নাম উঠে এসেছিল। নতুন করে ৩৩৮টি এজেন্সির নাম প্রকাশ করা হলেও বাস্তবে এর কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করা হবে এবং সহযোগী এজেন্সিগুলোর আসল ভূমিকা কী হবে— তা নিয়ে পুরো খাতেই এখন চরম ধোঁয়াশা বিদ্যমান। জানা গেছে, তালিকায় নাম থাকা ২৫টি মূল এজেন্সির কয়েকটির জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ক্লিয়ারেন্সের ডেটাবেজে পূর্বে কর্মী পাঠানোর কোনো তথ্য বা রেকর্ড নেই। এমনকি ১০ বছর পূর্বে লাইসেন্স নেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত একটি কর্মীকেও বিদেশে পাঠাতে সক্ষম হয়নি— এমন প্রতিষ্ঠানকে ‘প্রধান এজেন্সি’ হিসেবে প্রাধান্য দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী ও বিএমইটির কর্মকর্তারা। জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রা (ইঅওজঅ)-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, অতীতেও ১ হাজার ৪০০টির মতো রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ার সিস্টেমে তালিকাভুক্ত ছিল, কিন্তু কাজ করার সুযোগ পেয়েছিল মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এবার ২৫টি মূল এজেন্সির অধীনে থাকা অন্য ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি সরাসরি কাজের চাহিদাপত্র এনে কর্মী পাঠাতে পারবে, নাকি কেবল প্রধান ২৫টি এজেন্সির সাব-এজেন্ট বা মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে কাজ করবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হয়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য ও আইনি জটিলতার মধ্যেও দেশের প্রবাসীদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং বাজারটি দ্রুত সচল করতে সরকার নিজস্ব কূটনৈতিক চ্যানেলে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালিয়েছে। সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে শ্রমবাজার চালুর গতি ত্বরান্বিত হয়। সরকারের বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক ধাপে আগামী তিন মাসের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের (ইঙঊঝখ) মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা ‘জিরো কস্টে’ ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে সেবা খাতে নিয়োগ দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। এই ১০ হাজার কর্মীর বিমান ভাড়াসহ যাবতীয় অভিবাসন ব্যয় মালয়েশিয়ার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বহন করবে এবং জুনে যেতে না পারা প্রায় ৫ হাজার কর্মীকে এই তালিকায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী বিতর্কিত ও অনিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা কেন্দ্রগুলো বাদ দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি অনুমোদিত ১৬টি মেডিকেল সেন্টারের মাধ্যমে কর্মীদের শারীরিক পরীক্ষা কার্যক্রম শুরুর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। শ্রমবাজারকে পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত করতে কেবল তালিকা বড় করাই মূল সমাধান নয় বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অভিবাসন বিশ্লেষকেরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসনে মধ্যস্বত্বভোগী ও ছায়া সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ না করতে পারলে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত খরচের বোঝা চেপে বসা রোধ করা কঠিন হবে। অ্যাসোসিয়েট এজেন্সিগুলো যদি সরাসরি এফডব্লিউসিএমএস সিস্টেমে নিজ নিজ নামে কাজের ছাড়পত্র না পায়, তবে অভিজ্ঞতাহীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাজার পরিচালনা করতে গিয়ে নতুন করে প্রতারণা এবং কর্মী হয়রানির বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, আগামী ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান বিতর্কিত সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশকে একটি বড় নীতিগত সুযোগ এনে দেবে। নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের সময় কোনো বিশেষ শর্ত ছাড়াই দেশের সকল বৈধ ও নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত এবং অবাধ প্রতিযোগিতার নীতি বাস্তবায়ন করাই হবে দীর্ঘমেয়াদী একমাত্র টেকসই সমাধান। এছাড়া, সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে যাওয়ার পর মালয়েশিয়ার স্থানীয় শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদান, বিমানবন্দর থেকে সরাসরি নিজ কোম্পানিতে যোগদান নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং বজায় রাখা জরুরি।