অনলাইন ডেস্ক:
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ভোরে আল জাজিরা জানায়, একই সময়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, তাদের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে একটি দূরনিয়ন্ত্রিত মার্কিন ড্রোন নৌযানে হামলা চালিয়েছে। ইরানের দাবি, নৌযানটি হরমুজ প্রণালির ‘সুরক্ষিত এলাকায়’ প্রবেশের চেষ্টা করছিল।
আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই কৌশলগত জলপথ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নিয়ন্ত্রণে।” বিবৃতিতে আরও সতর্ক করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে অঞ্চল ছেড়ে যেতে হবে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার সন্ধ্যায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে পৃথক ফোনালাপ করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানায়, এসব আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় বিষয়, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং অঞ্চলকে স্থিতিশীল করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে কথা হয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চলমান অস্থিরতা নিয়েও আলোচনা হয়। আইআরআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের কারণে এই জলপথে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিতেও। তেল পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্সের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৩৯ শতাংশ কম ছিল। ওই দুই মাসে অঞ্চলটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছিল।
ট্যাংকারট্র্যাকার্সের হিসাবে, মে মাসে রপ্তানি কমে যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় ৬৭ শতাংশ নিচে নেমেছিল। আগস্টে সেই ঘাটতি কিছুটা কমে ৭২ লাখ ব্যারেল প্রতিদিনে দাঁড়ায়, যেখানে মে মাসে ঘাটতি ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় সামুদ্রিক পরিবহন সংকট তৈরি হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির তথ্যের ভিত্তিতে আল জাজিরা জানিয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা
ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননেও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। আল জাজিরার মাঠপর্যায়ের সংবাদদাতা জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননের কফর রেমান শহরের উপকণ্ঠে ইসরায়েলি বাহিনী গোলাবর্ষণ করেছে। এর আগে আরব সালিম, নাবাতিয়েহ আল ফাওকা এবং কফর রেমান এলাকায়ও হামলা হয়।
দক্ষিণ লেবাননের সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, আরব সালিম শহরে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। হামলার আগে ইসরায়েলি বাহিনী স্থানীয় বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, হিজবুল্লাহর একটি ড্রোন হামলার জবাবে এসব হামলা চালানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে দুটি বিস্ফোরক ড্রোন পাঠিয়েছিল। ওই ঘটনায় ইসরায়েলি বাহিনীর কোনো হতাহত হয়নি বলে দাবি করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
এর আগে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের আরব সালিম পৌর এলাকার বাসিন্দাদের জোরপূর্বক সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এল্লা ওয়াওয়েয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ভবন চিহ্নিত করে বাসিন্দাদের দ্রুত সরে যেতে বলেন। তার দাবি, ভবনটি হিজবুল্লাহর স্থাপনা এবং ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ড্রোন হামলার জবাবে সেখানে হামলা চালানো হবে।
গাজায় সাত ফিলিস্তিনি আহত
গাজাতেও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত সাত ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে। আহতদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, গাজার বিভিন্ন এলাকায় হামলায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে।
গাজা সিটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আল-খালিদি এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে ইসরায়েলি নৌবাহিনীর গোলাবর্ষণে দুজন আহত হন। আস-সুদানিয়া এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের আরেকটি শিবিরে হামলায় একটি শিশু আহত হয়েছে।
এ ছাড়া গাজা সিটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তুফাহ এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় আরও তিনজন আহত হন বলে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির বরাতে আনাদোলু জানিয়েছে। একই হামলায় আহত এক শিশুকে আল-আহলি আরব হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার আঘাতকে সামান্য বলে জানানো হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে অন্তত ১ হাজার ৩৪৪ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ৪৬৪ জন আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘর্ষ
ইয়েমেনেও হুথি বাহিনী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। বৃহস্পতিবার হুথিরা তাইজ ও হোদেইদাহর বিভিন্ন ফ্রন্টে বড় ধরনের অভিযান শুরু করার পর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও গোলাবারুদ ব্যবহারের পাশাপাশি স্থলবাহিনীও অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে।
সংঘর্ষের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে তাইজের পশ্চিমাঞ্চল এবং বাব আল-মান্দাবের কাছে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা আল-মাখা বন্দরসংলগ্ন এলাকা। ইয়েমেনের এক সরকারি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, হুথিরা বাব আল-মান্দাব ও আল-মাখার দিকে যাওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা দখলের চেষ্টা করছে।
তবে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী দাবি করেছে, তারা হোদেইদাহ প্রদেশের হায়েস জেলার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের কাছ থেকে পুনর্দখল করেছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, হায়েস শহর এবং আশপাশের গ্রামীণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেগুলো নিরাপদ করা হয়েছে। আল-বারা জংশনের আশপাশেও সরকারি বাহিনী অগ্রসর হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইয়েমেনে ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখলের পর থেকে সংঘাত চলে আসছে। পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হস্তক্ষেপ করে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির ফলে বড় ধরনের সংঘর্ষ অনেকটা কমে এলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ থমকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে ইয়েমেনে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিম তীরেও অভিযান
অধিকৃত পশ্চিম তীরের ক্বালকিলিয়া শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে এক ফিলিস্তিনি শিশু পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে। জেনিনে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
তুবাসের উত্তরে আক্কাবা এলাকায় অভিযান চালিয়ে অন্তত নয় ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। অভিযানে বাড়িঘর তল্লাশি, একটি গাড়ি জব্দ এবং স্থানীয় কয়েকজন তরুণকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে ওয়াফা জানিয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলে সামরিক প্রস্তুতি যাচাইয়ে আকস্মিক মহড়া শুরু করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। ‘ডন কস্ট ২.০’ নামে এই মহড়ার মাধ্যমে একাধিক ফ্রন্টে একই সময়ে বড় ধরনের সংঘাতের পরিস্থিতিতে সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে বলে ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে।
মহড়াটির নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলি সেনাপ্রধান আইয়াল জামির। এতে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন আঞ্চলিক কমান্ড, শাখা ও ইউনিটের কমান্ডাররা অংশ নিচ্ছেন। রিজার্ভ সেনাদেরও সক্রিয় করা হয়েছে এবং সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে বলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।











