নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়ী করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, দ্রুত দেশে আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্বে রেখে তা সম্ভব নয়।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময় অসংলগ্ন বক্তব্য দিচ্ছেন এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। সংস্কার ইস্যুতেও তিনি জাতির সঙ্গে প্রতারণামূলক কথা বলেছেন বলে দাবি করেন নাহিদ।
নাহিদ বলেন, সংসদে পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জবাবদিহির আওতায় আনা হলে বা প্রশ্ন করা হলে তিনি রাজপথের বক্তব্য কিংবা পল্টনের বক্তব্য বলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতেন।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙচুরের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ বলেন, রাজধানীর মিরপুরে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ভাঙচুরের ঘটনা চলেছে। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির সম্পৃক্ততা, একজন নারী সংসদ সদস্যের নাম ওঠা এবং পুলিশ প্রশাসনের নীরবতার মধ্য দিয়ে ঘটনাটি ঘটেছে।
তাঁর ভাষ্য, ঢাকার মতো একটি শহরে তিন ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চলবে অথচ প্রশাসন কিছুই করতে পারবে না, এটি হতে পারে না। রাড্ডা সেন্টারের ঘটনা বিএনপির বিরুদ্ধে তাঁর উত্থাপিত দখলদারি, চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের অভিযোগেরই ধারাবাহিকতা বলেও দাবি করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের অফিস ভাঙচুরের ঘটনাতেও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে। তাঁর অভিযোগ, দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকরভাবে কাজ করছে না।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে মব কালচার বন্ধ হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে, এমন কথা বলা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন নাহিদ। তাঁর দাবি, বিএনপি সরকার গঠনের পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে এবং সরকার নিজেদের দলীয় নেতাকর্মীদেরও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
দেশের বিভিন্ন স্থানে দখলদারি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের পাশে দাঁড়ানো তাদের দায়িত্ব। সারাদেশের নেতাকর্মীদের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দখলদারি ও চাঁদাবাজি রুখে দেওয়ার জন্যও আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও ভেরিফিকেশনের নামে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, ভিন্নমতের প্রার্থীদের বাদ দিয়ে সরকারি চাকরিকে রাজনৈতিক ও দলীয়করণ করা হচ্ছে। তবে সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া ভেরিফিকেশনের নামে কাউকে বাদ দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ থেকে বাদ পড়া আড়াই হাজার ব্যক্তির প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, তাদের প্রত্যেককে নিয়োগ দিতে হবে। যদি তাদের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড না থাকে, তাহলে তাদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি। অন্যায়ভাবে একজনকেও বাদ দেওয়া হলে এনসিপি তাঁর পক্ষে লড়বে বলেও জানান।
সংবিধান সংস্কার নিয়েও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, কালক্ষেপণের মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমন কোনো প্রক্রিয়া এনসিপি মেনে নেবে না, যার মাধ্যমে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের দাবিও জানান তিনি।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন নাহিদ। তাঁর দাবি, ওই বক্তব্যে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও জুলাইয়ের চেতনা প্রতিফলিত হয়নি। জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট, ভারতের ষড়যন্ত্র, গণহত্যার বিচার, সীমান্ত হত্যা, পুশইন, রোহিঙ্গা সংকট ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত ও যথাসময়ে আয়োজনের দাবি জানিয়ে নাহিদ বলেন, নির্বাচনে ন্যূনতম মাত্রায়ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আভাস পাওয়া গেলে এনসিপি বসে থাকবে না। তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশনে দলীয় নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সরকারি চাকরির ভেরিফিকেশন ও ভাইভার নামেও দলীয়করণের অভিযোগ তোলেন নাহিদ। তাঁর দাবি, আগের সরকারের সময়কার পদ্ধতির মতোই বর্তমানে ভাইভার নম্বর বাড়িয়ে দলীয়করণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে এনসিপির তরুণ নেতৃত্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। পুলিশকে দলীয় কাজে ব্যবহার করা হবে কি না, সে বিষয়ে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি, দলের কেন্দ্রীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মাহমুদা মিতুসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।











