নির্বাচনে প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট কেন বাধ্যতামূলক নয়, হাইকোর্টের রুল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জাতীয় সংসদসহ দেশের সব ধরনের নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হবে না কেন, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ডোপ টেস্টে মাদক গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেলে বা কোনো প্রার্থী পরীক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা এবং মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ডোপ টেস্টের সনদ জমা দেওয়ার বিধান করা হবে না কেন, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

 

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে এই রুল জারি করেন।

 

জনস্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত জাহান অনি রিটটি করেন। রিটে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদসহ সব নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার বিধান প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।

 

বর্তমান নির্বাচনি আইন ও বিধিমালায় প্রার্থীদের মাদক পরীক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সরকারি চাকরিজীবী ও পুলিশ সদস্যদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক। এ অবস্থায় জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেও মাদক পরীক্ষা চালুর বিষয়টি রিটে তুলে ধরা হয়েছে।

 

রিটে বলা হয়েছে, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় সরকার অনুমোদিত হাসপাতাল বা স্বীকৃত ল্যাবরেটরি থেকে ডোপ টেস্টের সনদ জমা দেওয়ার বিধান করা যেতে পারে। ডোপ টেস্টে মাদক গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল বা তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান করার কথাও বলা হয়েছে।

 

এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে কোনো প্রার্থী ডোপ টেস্ট করাতে অস্বীকৃতি জানালে বা পরীক্ষায় অংশ না নিলে তার প্রার্থিতা বাতিলের বিধান কেন করা হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

 

ডোপ টেস্টের ফল নিয়ে কোনো প্রার্থী আপত্তি করলে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ রাখার বিষয়টিও রিটে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষার নমুনা সংরক্ষণ, অনুমোদিত পরীক্ষাগার, ফলাফল যাচাই এবং আপিলের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান করার বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়েছে।

 

রিটকারী আইনজীবী ইসরাত জাহান অনি বলেন, জনপ্রতিনিধিদের মাদকমুক্ত থাকা প্রয়োজন। তার ভাষায়, নাগরিকেরা নিয়মিত কর দেন এবং তাদের প্রতিনিধিত্ব করেন সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা। তাই জনপ্রতিনিধিরা মাদকাসক্ত হলে জনগণের অধিকার যথাযথভাবে আদায় ও প্রতিনিধিত্ব করা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

 

তিনি বলেন, “আমরা নাগরিকরা নিয়মিত কর (ট্যাক্স) প্রদান করি। আমাদের প্রতিনিধিত্ব যারা করবেন, তা সংসদ সদস্য হোক কিংবা স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি, তাদের অবশ্যই মাদকমুক্ত ও সুস্থ মানসিকতার (সাউন্ড মাইন্ড) হতে হবে। মাদকাসক্ত কোনো ব্যক্তি জনগণের সঠিক অধিকার আদায় বা প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না।”

 

মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সরকারি স্বীকৃত ল্যাবরেটরি বা হাসপাতাল থেকে ডোপ টেস্টের সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। তার বক্তব্য, কোনো প্রার্থী মাদকাসক্ত না হলে ডোপ টেস্টে অংশ নিতে তার আত্মসম্মানে আঘাত লাগার কারণ নেই। বরং তিনি গর্বের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নেবেন।

 

এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে ধূমপান ও মাদকবিরোধী ফাউন্ডেশন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের হলফনামার সঙ্গে ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন সংযুক্ত করার দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছিল। মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের সময় ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার দাবিও জানিয়েছিল সংগঠনটি।

 

রিটে আরও বলা হয়েছে, প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার বিধান চালু হলেও পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে কোনো প্রার্থীর ডোপ টেস্ট ‘পজিটিভ’ হলে সরাসরি প্রার্থিতা বাতিল করা হবে, নাকি দ্বিতীয়বার পরীক্ষা ও অনুমোদিত ল্যাবরেটরিতে ফল নিশ্চিত করার সুযোগ থাকবে, সেটিও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

 

কোনো বৈধ ওষুধ সেবনের কারণে পরীক্ষায় নিষিদ্ধ কোনো উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ থাকা, পরীক্ষার ফলের বিরুদ্ধে আপিল এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসা-তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়েও সুস্পষ্ট বিধান প্রয়োজন বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

রিটকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা জনগণের ভোটে রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। তাই প্রার্থীদের মাদক গ্রহণের বিষয়টি জনস্বার্থ, নির্বাচনি স্বচ্ছতা ও জনপ্রতিনিধিত্বের মানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

 

একই সঙ্গে ডোপ টেস্টের মতো বিধান চালু হলে তা নির্ভুল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ভিত্তিতে করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে রিটে তুলে ধরা হয়েছে। কোনো ভুল বা অসম্পূর্ণ পরীক্ষার ফলের কারণে যেন কোনো প্রার্থী তার নির্বাচনি অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

 

হাইকোর্টের রুলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্থানীয় সরকার সচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি), নির্বাচন কমিশন সচিব এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ মোট সাতজনকে বিবাদী করা হয়েছে। তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

 

রিটে আরও একটি বিষয় জানতে চাওয়া হয়েছে, জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন দাখিলের বিধান প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না।