ভারত ‘সন্ত্রাসবাদ রফতানি’ করছে, লন্ডনে বিস্ফোরক অভিযোগ পাকিস্তানি পরমাণু উপদেষ্টার

অনলাইন ডেস্ক:

তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) মতো সশস্ত্র দলগুলোকে মদদ দিয়ে ভারত রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাসবাদে ইন্ধন জোগাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র বিষয়ক এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। গত ১৩ অক্টোবর লন্ডনে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন তিনি।

পাকিস্তানের ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির (এনসিএ) উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাযহার জামিল লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে (আইআইএসএস) আয়োজিত এক কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এই অভিযোগ করেন। তার দাবি, নয়াদিল্লি একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত নীতি হিসেবে ‘সন্ত্রাসবাদ রফতানি’ করছে এবং পাকিস্তানে অস্থিতিশীলতা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যেই তথাকথিত ‘ডোভাল ডকট্রিন’ বাস্তবায়ন করে চলেছে।

‘দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে পরমাণু প্রতিরোধ ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ শীর্ষক ট্র্যাক ১.৫ এর ওই কর্মশালায় জামিল অতীতে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের নানা অভিযোগ তোলেন। এ সময় তিনি ১৯৮০-এর দশকে এলটিটিইকে সহায়তা এবং ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আফগান-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতের ছয়টি কনস্যুলেট পরিচালনার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে মাযহার জামিল অভিযোগ করেন, অতীতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরিচালনার সময় ভারত দ্বৈত ক্ষমতার অধিকারী ব্রাহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল। তার দাবি, এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র পারমাণবিক এবং প্রচলিত—উভয় ধরনের যুদ্ধাস্ত্র বহনেই পুরোপুরি সক্ষম।

২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরমাণু অস্ত্র পরিচালনাকারী ইউনিট স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের (এসপিডি) মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করা জামিল বলেন, গত বছর ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালে ভারত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলকে এক ভয়াবহ পরমাণু বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সে সময় শুধুমাত্র পাকিস্তানের কৌশলগত সংযমের কারণেই বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

সুইডিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এসআইপিআরআই-এর সাম্প্রতিক একটি মূল্যায়নের উদ্ধৃতি দিয়ে এই পাকিস্তানি উপদেষ্টা বলেন, সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের মাধ্যমে ভারত মূলত ‘ফার্স্ট-স্ট্রাইক সক্ষমতা’ অর্জনের দিকে এগোচ্ছে। তিনি জানান, সাবমেরিনের সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করে সমুদ্রে ভারতের নিয়মিত টহল ভুল হিসাব-নিকাশ ও মারাত্মক বিভ্রান্তির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ভারতের পারমাণবিক নীতিমালায় প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালানোর বিষয়টি স্পষ্টভাবে নাকচ করা হয়েছিল। সেখানে ‘প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পরমাণু প্রতিরোধ’ এবং ‘কেবলমাত্র পাল্টা আক্রমণ’ বা ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ (এনএফইউ) নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়। তবে জামিলের দাবি, ভারতের এই নীতি কেবলই একটি কূটনৈতিক চাল। তিনি জানান, ভারতের পরমাণু নীতির অন্যতম প্রণেতা ও সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন অন-রেকর্ড বলেছেন যে দেশটির পারমাণবিক নীতিতে প্রথম আঘাত হানার বিকল্প রাখার মতো নমনীয়তা রয়েছে।

এ ছাড়াও, ২০২২ সালে ভারতীয় বিমানবাহিনী থেকে দুর্ঘটনাবশত উৎক্ষেপিত হওয়া একটি ব্রাহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের ঘটনাকে পাকিস্তানের ওপর ‘ইচ্ছাকৃত হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেন জামিল। সে সময় ভুলবশত ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের খানেওয়াল জেলায় গিয়ে পড়েছিল।

এদিকে যুদ্ধাবস্থায় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার হিসেবে তুরস্ক ও সৌদি আরব পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াবে কি না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। তবে তিনি ওই চুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে আত্মরক্ষামূলক বলে উল্লেখ করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এনসিএ-র প্রধান হিসেবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দায়িত্ব পালন করলেও, গত নভেম্বরে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড গঠনের মাধ্যমে পাকিস্তানের সমস্ত পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর একক নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত অস্ত্র থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।