কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: আরও এক দেহাবশেষ উদ্ধার, ১০ পর্যটকের মরদেহ হস্তান্তর

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ১০ দিন পর আরও একটি দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপের দ্বিতীয় তলার কার্নিশ থেকে দেহাবশেষটি উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সদস্যরা। নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার দেহাবশেষ এটি কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে অগ্নিকাণ্ডে আগে উদ্ধার হওয়া ১০ পর্যটকের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার পর মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে তাঁদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহগুলো পরিবারের সদস্যদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ১০ দিন পর স্বজনদের মরদেহ হাতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। মরদেহ হস্তান্তরের সময় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নিহতদের দাফন ও মরদেহ পরিবহনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে মোট আড়াই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

 

গত ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার ইনানী এলাকার পাটুয়ারটেক সৈকতের কাছে কাঠের তৈরি তিনতলা টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। ওই দিন ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আগুনে মরদেহগুলো পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

 

তবে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁকে খুঁজতে মঙ্গলবার সকালে আবারও রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস। এ সময় দ্বিতীয় তলার কার্নিশ থেকে আগুনে পুড়ে কঙ্কালসার দেহাবশেষটি উদ্ধার করা হয়।

 

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, নিখোঁজ নাসরিন আক্তারকে খুঁজতে গিয়ে তল্লাশির সময় দেহাবশেষটি পাওয়া গেছে। এটি তাঁর কি না, তা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

 

নাসরিন সাভারের আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। দুই বান্ধবীর সঙ্গে বেড়াতে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর স্বামী দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি।

 

নাসরিনের স্বামী দেওয়ান ফয়সাল উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষটি দেখেছেন। তাঁর দাবি, দেহাবশেষটির গলায় থাকা স্বর্ণের চেইন দেখে সেটিকে তাঁর স্ত্রীর বলে মনে হয়েছে। ফয়সালের ভাষ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের সময় নাসরিন রিসোর্টের একটি কক্ষে ছিলেন। আগুন লাগার আগে তাঁর সঙ্গে থাকা দুই বান্ধবী কক্ষ থেকে বের হতে পারলেও নাসরিন ভেতরে আটকা পড়েন। এরপর থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

 

ফয়সাল জানান, সোমবার তিনি পুলিশ ও প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও স্ত্রীর বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাননি। পরে স্বজনদের নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। মঙ্গলবার উদ্ধার অভিযানের সময় দেহাবশেষটি পাওয়া যায়। তবে স্বর্ণের চেইন দেখে স্বামীর ধারণা এবং ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়। কর্তৃপক্ষ ফরেনসিক পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় রয়েছে।

 

উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আকতার জানান, ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া ১০ জনের মধ্যে নাসরিন ছিলেন না। এ কারণে তাঁকে খুঁজতে নতুন করে অভিযান চালানো হয়। উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষটি নাসরিনের বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরিচয় নিশ্চিত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

এর আগে তদন্ত কমিটির প্রধান কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানিয়েছিলেন, নাসরিনের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁর মুঠোফোন নম্বরের তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি রিসোর্টের ভেতরে ছিলেন, নাকি বাইরে, তা নিশ্চিত করতে পুলিশের বিশেষ শাখা ও তদন্তকারী দল কাজ করছিল।

 

ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ১০ জনের মধ্যে একটি পরিবারের ছয়জন এবং অন্য একটি পরিবারের চারজন রয়েছেন। তাঁরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।

 

নিহত ছয়জন হলেন মৌলিতা মেহজাবিন (১৯), লায়লা জাহান (২৫), ইসরাত জাহান (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)। তাঁরা ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন।

 

নিহতদের মধ্যে মৌলিতা মেহজাবিন, লায়লা জাহান ও মোহাম্মদ নাফিস তেহামি শিক্ষার্থী ছিলেন। নাফিস তেহামি ‘জেরিফ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। মৌলিতা মেহজাবিন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে জনসংখ্যা ও জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করতেন। লায়লা জাহান ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী।

 

অন্য পরিবারের নিহত চারজন হলেন ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।

 

নিহত ছয়জনের মরদেহ গ্রহণ করেন ঢাকার খিলগাঁও-মুগদা এলাকার আমিনুল ইসলাম খান। তাঁদের মধ্যে চারজন তাঁর ভাগনি, একজন ভাগনে এবং একজন নাতি।

 

মরদেহ গ্রহণের পর আমিনুল ইসলাম খান বলেন, “আমাদের পরিবারের ছয়জন এবং যশোরের আরেক পরিবারের চারজনের মরদেহ বুঝিয়ে দিয়েছে প্রশাসন। আমরা মরদেহ নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয়েছি।”

 

দীর্ঘ ১০ দিন পর স্বজনদের মরদেহ পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, যাঁদের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাঁদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

 

অন্য পরিবারের চারজনের মরদেহ গ্রহণ করেন নাহিদুর রহমানের বড় ভাই জাহিদুর রহমান। তাঁর বাড়ি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামে।

 

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় জড়িত কেউ ছাড় পাবে না বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

 

রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত চলছে। পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার গাফিলতি পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

এ ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক। রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোর্শেদও আত্মগোপনে রয়েছেন।

 

মামলায় গ্রেপ্তার এক আসামির সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পলাতক ও অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ, সিআইডি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।

 

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও নতুন করে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষটির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।