অনলাইন ডেস্ক:
ইউক্রেনের রুশ-নিয়ন্ত্রিত ওলেশকি শহরে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরুর পথ সুগম করতে গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষ। তবে এই যুদ্ধবিরতির মধ্যেও রাজধানী কিয়েভসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে হামলা ও সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসান অঞ্চলে নিপ্রো নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত ওলেশকি শহরে বর্তমানে খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আশা করা হচ্ছে যে, এই যুদ্ধবিরতির ফলে সেখানে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং সম্মুখসারির ওই শহর থেকে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
ইউক্রেনের পার্লামেন্টের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনার ও দেশটির আলোচক দলের প্রধান দিমিত্রো লুবিনেৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ইউক্রেনের আলোচক দলের প্রধান হিসেবে নিশ্চিত করছি, ইউক্রেনীয় পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে।
যুদ্ধবিরতির সময়সূচি নিশ্চিত করে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। টেলিগ্রামে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ওলেশকিতে মানবিক কার্যক্রমের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মস্কোর স্থানীয় সময় ভোর ৪টা থেকে ইউক্রেনের খেরসন শহরের দিকে গোলাবর্ষণ বন্ধ রাখা হয়েছে, যে শহরটি নিপ্রো নদীর অপর তীরে বর্তমানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
দিমিত্রো লুবিনেৎস আরও জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বয় করে এবং রাশিয়ার মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনার ইয়ানা লান্ত্রাতোভার সহযোগিতায় এই পারস্পরিক সমঝোতা অর্জন সম্ভব হয়েছে।
এদিকে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা বলা হলেও গত মঙ্গলবার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে নতুন করে হামলা চালানো হয়। এই হামলায় শহরের সাউদার্ন ব্রিজ ও মেট্রোর অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন, আর সে সময় কিয়েভে তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথাও জানান এক প্রত্যক্ষদর্শী।
ওলেশকি শহরটি মূলত ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসান অঞ্চলে নিপ্রো নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত যার নদীর অপর তীরেই রয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খেরসান শহর। তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর একেবারে প্রথম দিকেই ওলেশকি দখল করে নেয় রুশ সেনারা এবং তখন থেকেই শহরটি রাশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে স্থায়ী শান্তিচুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন— উভয় পক্ষের সঙ্গেই নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত এই যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে জোরালো মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
গত শুক্রবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা আগামী নভেম্বরের প্রথমার্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছেন।
তবে এমন কূটনৈতিক তৎপরতা ও যুদ্ধবিরতির উদ্যোগের মধ্যেই রাশিয়া ও ইউক্রেনের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে হামলা এবং হতাহতের বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
গত সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার চালানো আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি ছাত্রাবাসের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এ ছাড়া ইউক্রেনের খারকিভ ও পাভলোহ্রাদ শহরেও রুশ হামলায় বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে, টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তারা কিয়েভের মূল পরিবহন অবকাঠামো, খারকিভ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রসদ সরবরাহকেন্দ্র এবং অন্যান্য এলাকার বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও পণ্যবাহী জাহাজে সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে। মন্ত্রণালয়টির দাবি, এই সমস্ত স্থাপনা সরাসরি সামরিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
এর বিপরীতে ইউক্রেন সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত পশ্চিম রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক শহরে চালানো ড্রোন হামলায় একজন নিহত এবং আরও ছয়জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের রুশ-নিয়ন্ত্রিত একটি এলাকায় যাত্রীবাহী বাসে ড্রোন আঘাত হানলে আরও একজন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন বলে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
তবে এসব পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীন কোনো সূত্রের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আর বরাবরের মতো রাশিয়া ও ইউক্রেন— উভয় দেশই ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের কোনোভাবেই লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ কঠোরভাবে অস্বীকার করে আসছে।











