চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসাতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন: নেপথ্যে কোন রহস্য?

অনলাইন ডেস্ক:

চাঁদের মাটিতে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন এবং সেখানে লুকিয়ে থাকা মূল্যবান বরফ ও খনিজ সম্পদ আহরণের লক্ষ্যে এক রোমাঞ্চকর ও তীব্র প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের তিন মহাশক্তিধর দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন। চাঁদে বড় পরিসরে খননকাজ পরিচালনা করতে হলে প্রভূত পরিমাণে বিদ্যুতের প্রয়োজন, যা নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করার একমাত্র কার্যকর ও যুগোপযোগী উপায় হিসেবে বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক চুল্লি বা নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের কথা বিবেচনা করছেন।

বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, চাঁদের বেশ কিছু গভীর খাদ রয়েছে যেখানে চিরকাল সূর্যের আলো পৌঁছায় না এবং ওই অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে পানি বরফ আকারে জমে আছে। এই বরফ সফলভাবে গলিয়ে ভবিষ্যতে চাঁদে পদার্পণকারী ও বসবাসকারী নভোচারীদের জন্য জীবনরক্ষাকারী খাবার পানি, শ্বাস নেওয়ার বাতাস এবং রকেটের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তৈরি করা সম্ভবপর হবে। এছাড়া বিখ্যাত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণের উদ্দেশ্যে চাঁদের মাটি থেকে অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম ও সিলিকনের মতো বহুমূল্য খনিজ তোলার সুদূর প্রসারী পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছেন।

তবে এই বিশাল কলেবরের বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের জন্য গতানুগতিক সোলার প্যানেল বা সাধারণ ব্যাটারির ওপর ভরসা করে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর মূল কারণ হলো চাঁদের যেকোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে একটানা দুই সপ্তাহ তীব্র দিন এবং পরবর্তী দুই সপ্তাহ দীর্ঘ রাত থাকে, যা সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়। আর এই অনিবার্য শক্তির সংকট মোকাবিলা করতেই একমাত্র পারমাণবিক শক্তিকে সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য ভরসা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদের বুকে নিজস্ব একটি পারমাণবিক চুল্লি সফলভাবে স্থাপন করতে চায়। ‘লুনার রিয়্যাক্টর ১’ নামক এই উচ্চাভিলাষী চুল্লিটির ওজন হবে প্রায় ছয় হাজার কেজি এবং এটি যেকোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই একটানা পাঁচ বছর ধরে ২০ কিলোওয়াট করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে ‘সেলেনা’ নামের তুলনামূলক ছোট একটি চুল্লি নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যার মোট ওজন মাত্র এক হাজার কেজির মতো। এই চুল্লিটি থেকে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে এবং এটি একটানা দশ বছর সচল থাকতে পারবে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ২০৩৬ সালের মধ্যে এটিকে চাঁদের মাটিতে স্থাপন করা।

চাঁদের মতো দুর্গম স্থানে এসব ভারী পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল একটি কাজ, যা পৃথিবী থেকে শক্তিশালী রকেটের মাধ্যমে বহন করে নিয়ে গিয়ে চাঁদের পিঠে অত্যন্ত ধীরে ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তার সঙ্গে নামাতে হবে। যেকোনো ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, চুল্লিগুলো চাঁদে নিরাপদে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত একদম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে। তবে এই সামগ্রিক প্রতিযোগিতার নেপথ্যে বিজ্ঞানচর্চার চেয়েও মূলত ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারের সুদূর প্রসারী লড়াই কাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ এবং চীন ও রাশিয়ার নানামুখী কূটনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপে এই মহাকাশ দৌড় এখন আরও বহুগুণ বেশি গতি পেয়েছে।

এই পুরো জটিল প্রক্রিয়ার সঙ্গে কিছু মারাত্মক ঝুঁকিও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। রকেট উৎক্ষেপণের সময় যদি কোনো কারণে আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটে, তবে সুদূর মহাশূন্যে বা বায়ুমণ্ডলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা থেকেই যায়। এর ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে ১৯৭৮ সালে, যখন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি পারমাণবিক স্যাটেলাইট আকস্মিক নষ্ট হয়ে কানাডার বিশাল এলাকজুড়ে মারাত্মক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দিয়েছিল। যদিও বর্তমান বিজ্ঞানীরা বারবার দাবি করে আসছেন যে, চাঁদের বুকে যদি ভবিষ্যতে কখনো এ ধরনের অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা ঘটেও, তবে তার ক্ষতিকর প্রভাব কেবল ওই নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যেই সম্পূর্ণ সীমাবদ্ধ থাকবে।

এ ছাড়াও প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী চাঁদের নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডের ওপর বিশ্বের কোনো একক দেশেরই সার্বভৌম মালিকানা বা অধিকার নেই। তা সত্ত্বেও, কোনো পরাশক্তি দেশ যদি সেখানে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করে পুরো আশপাশের এলাকা নিজের কঠোর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, তবে সুদূর ভবিষ্যতে তা নিয়ে গুরুতর আন্তর্জাতিক আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক।