নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ভর্তুকি ও শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালের গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুৎ চাহিদা মোকাবিলায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুরের প্রথম ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরুর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেয়েছে। গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) স্টেজ-সি পর্যায়ের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর কার্যক্রমের অনুমতি দেয়। পরদিন থেকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু হয়। এটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হলেও এখনো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়নি। টারবাইন পরীক্ষা, গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং আরও কিছু নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের পর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হবে। ২০২৭ সালের গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার আগে এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষের তুলনায় বিশ্বে পর্যবেক্ষণাধীন তেলের মজুত ৫০ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল কমেছে। স্থলভাগে তেলের মজুত ২০১৬ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। প্রতিবেদন তৈরির সময় উত্তর সাগরের ডেটেড ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৩৪ ডলার। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনায় ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ও ২০০ ডলার দামের সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এলএনজি, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, কয়লা, পরিবহন ও বিমা ব্যয়ের পরিবর্তনও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। এগুলো সম্ভাব্য পূর্বাভাস নয়, বরং ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষামূলক হিসাব।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বিশ্বের অন্যতম বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব পড়ে। সরকার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে দিন-রাত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুতের মতো স্থিতিশীল ভিত্তিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
দেশের জ্বালানি খাতে বর্তমান ঝুঁকির পেছনে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ ও চুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্তের প্রভাব রয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময় ভাড়াভিত্তিক ও স্বতন্ত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র, আমদানিকৃত এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে বিনিয়োগ বাড়লেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন সেই অনুপাতে এগোয়নি। কোনো সরকার পরিকল্পিতভাবে আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়েছে কি না, তা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ও সুবিধাভোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে ব্যয়বহুল জ্বালানি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব পরিমাপযোগ্য।
২০২৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে গড়ে ২৭ টাকা ২৯ পয়সা ব্যয় হয়েছে। এ হিসাবের মধ্যে প্রযোজ্য চুক্তিভিত্তিক সক্ষমতা বাবদ অর্থও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের গড় ক্রয়মূল্য ছিল ১৩ টাকা ২৮ পয়সা এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ৬ টাকা ৪৯ পয়সা। জ্বালানি তেলভিত্তিক সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের হিসাব এখানে অন্তর্ভুক্ত, শুধু ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রের নয়। এ হিসাব থেকে স্পষ্ট, বিপিডিবির বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল অন্যতম ব্যয়বহুল উৎস।
জ্বালানি আমদানির ব্যয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এলএনজি, কয়লা, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও বিদ্যুৎ আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার জোগাড় করতে হয় রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে টাকার বিনিময় হার, সরকারি ভর্তুকি, বিদ্যুতের দাম এবং শিল্প উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে। গত সেপ্টেম্বরে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ স্বীকার করেছিলেন, ব্যয়বহুল এলএনজির কারণে শিল্প উৎপাদন ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত ২৭ অক্টোবর তিনি সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর শুল্কছাড় এবং ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেন। উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
এ পরিস্থিতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একই প্রযুক্তির ছয়টি ভিভিইআর-১২০০ পারমাণবিক চুল্লি প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করা থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে প্রায় ৬ দশমিক ৮ থেকে ৯ দশমিক ২ মাস সময় নিয়েছে। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে গত ১১ অক্টোবর প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়। সে হিসাবে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু করা উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। তুলনামূলক বিশ্লেষণে বাণিজ্যিক উৎপাদনের আরও সতর্ক সময়সীমা ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধরা হয়েছে।
প্রথম ইউনিটের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সরকারকে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞ জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি টারবাইন, জেনারেটর, নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থার পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও গ্রিড পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রস্তুতিও শেষ করতে হবে। বড় কোনো ইউনিট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত বিকল্প সক্ষমতা রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে এসব কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার অর্থ কোনোভাবেই পারমাণবিক নিরাপত্তা পরীক্ষা সংক্ষিপ্ত করা নয়। নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্তের পূর্ণ মর্যাদা বজায় রাখতে হবে।
রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের প্রস্তুতিও একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এ ইউনিটের প্রথম দফার জ্বালানি বিভিন্ন চালানে দেশে পৌঁছালেও এখনো চুল্লিতে স্থাপন করা হয়নি। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্যে বলা হয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২৭ সালের জুনে জ্বালানি স্থাপনের সম্ভাব্য সময় প্রস্তাব করেছে। তবে ২০২৭ সালের মধ্যেই ইউনিটটির হস্তান্তর নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে ২০২৭ সালের গ্রীষ্মে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়াকে নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। কারিগরি নিয়ম মেনে নির্মাণকাজ, বিভিন্ন ব্যবস্থার পরীক্ষা, জনবল প্রস্তুতি ও জ্বালানি স্থাপনের কার্যক্রম পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হবে।
এদিকে জ্বালানি আমদানির আর্থিক ঝুঁকিও কম নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার থেকে ২০০ ডলারে উঠলে একই পরিমাণ তেল আমদানির ব্যয় দ্বিগুণ হবে। উদাহরণ হিসেবে, ১ কোটি ব্যারেল তেল আমদানিতে প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার দাম বাড়লে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১০০ কোটি ডলার। এর সঙ্গে পরিশোধিত পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য, পরিবহন ও বিমা ব্যয় যুক্ত হলে আর্থিক চাপ আরও বাড়বে। তাই ২০২৭ সালের গ্রীষ্মের জন্য সরকারকে মাসভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করতে হবে। সেখানে দেশীয় গ্যাস, কয়লা, তেল, সৌরবিদ্যুৎ, আমদানিকৃত বিদ্যুৎ এবং রূপপুর থেকে বাস্তবসম্মত উৎপাদনের পরিমাণ তুলে ধরতে হবে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত পরীক্ষার সব শর্ত পূরণ করে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে যত দ্রুত সম্ভব নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিংয়ের প্রস্তুতি, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও পুরোনো কূপের সংস্কার এবং বিকল্প উৎস থেকে সাশ্রয়ী জ্বালানি সংগ্রহে জোর দিতে হবে। ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রথম ইউনিটের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনকে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হিসেবে রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে পরবর্তী সময় পর্যন্ত উৎপাদন শুরুর বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখতে হবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত সক্ষমতা থাকলেই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; চাহিদার সময় সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ২০২৭ সালের শেষ প্রান্তিকের মধ্যে রূপপুরের দুই ইউনিট মিলিয়ে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাজে লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে সরকারকে এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।











