নিজস্ব প্রতিবেদক:
সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে টানা শ্রমিক বিক্ষোভ ও দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় এ পর্যন্ত পুলিশের প্রায় ৫০ জন সদস্য আহত হয়েছেন। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির জেরে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত এই শিল্পাঞ্চলের শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
গত ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে দেওয়ান পাম্পের পাশে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি জানান, বর্তমানে শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
চলমান আন্দোলনকে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে এই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র চলছে বলে জোরালো অভিযোগ করেন এসপি মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, সাধারণ ও খেটে খাওয়া শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ কর্মস্থলে কাজ চালিয়ে যেতে চান; কিন্তু বহিরাগত কিছু কুচক্রী মহলের ইন্ধনে একটি পক্ষ প্রতিদিন সকালে কাজে যোগ দিতে আসা সাধারণ শ্রমিকদের নানাভাবে উসকানি দিয়ে জোরপূর্বক কারখানা থেকে বের করে আনার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
শ্রমিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শিল্প পুলিশ সবসময় সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে বলে দাবি করেন এসপি। তিনি বলেন, শ্রমিকরা যাতে সম্পূর্ণ নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন, সে জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে কিছু কারখানার শ্রমিকেরা বাধ্য হয়েই কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য।
শিল্প পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা আরও জানান, শ্রমিকদের যেকোনো ন্যায্য পাওনা আদায়ের আইনি লড়াইয়েও পুলিশ সবসময় তাদের পাশে থেকে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অতীতে এক মালিক তার শ্রমিকদের চার মাসের বকেয়া বেতন না দিয়ে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন; পরবর্তীতে পুলিশ সেই মালিককে আটক করে আশুলিয়া থানার মাধ্যমে শ্রমিকদের সমুদয় পাওনা পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এই ন্যায়বিচারের কারণে শ্রমিকেরা স্বয়ং পুলিশের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা শুধু শ্রমিকদের সুষ্ঠুভাবে কাজের পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। কিন্তু একটি কুচক্রী মহলের ইন্ধনে শ্রমিকদের একটি অংশ কারখানা থেকে জোর করে বেরিয়ে এসে আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্য ও অন্যান্য সচল কারখানার ওপর অতর্কিত ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছে। এ ধরনের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার্থে এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আমরা তাদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছি। আমরা কোনোভাবেই শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ নই।’
সরকার কর্তৃক সদ্য ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও শিল্প পুলিশ সবসময় শ্রমিকদের সর্বাত্মক পাশে থেকে একাত্ম হয়ে কাজ করবে বলে স্পষ্ট ভাষায় জানান এসপি মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।
সারাদেশের তুলনায় বর্তমান কারখানা বন্ধের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে এসপি জানান, তার সরাসরি আওতাধীন আট শতাধিক কারখানার মধ্যে বর্তমানে শতাধিক কারখানা বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে নরসিংহপুর, নিশ্চিন্তপুর ও জিরাবো এলাকার কিছু নির্দিষ্ট কারখানা ছাড়া সাভারের অন্যান্য এলাকার সিংহভাগ কারখানাতেই উৎপাদন কার্যক্রম সচল রয়েছে। তবে কিছু কিছু কারখানায় সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে।
দুপুরের পর বেশ কয়েকজন কারখানা মালিক ফোনে যোগাযোগ করে তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান চালু রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা চেয়েছেন বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, মালিকপক্ষের নিরাপত্তায় পুলিশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত কারখানা খুলে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ পুনরায় শুরু করার জন্য মালিকপক্ষের প্রতি জোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
চলমান সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের গুরুতর আহত হওয়ার বিস্তারিত তুলে ধরে এসপি মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, এই আকস্মিক সংঘর্ষে এ পর্যন্ত আমাদের প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত সোমবারই আহত হয়েছেন প্রায় ২০ জন। বিশেষ করে আজকের ঘটনায় একজন পুলিশ সদস্যের মাথায় সরাসরি ইটের গভীর আঘাত লেগেছে, যার ফলে তার মাথায় চারটি সেলাই দিতে হয়েছে। বর্তমানে তাকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রেখে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।











