শেখ হাসিনা আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবেন না: তথ্য উপদেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে বর্তমানে স্বাভাবিক রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর অবস্থায় নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে দলটির নেতাকর্মীদের কাছে বিপুল অর্থসম্পদ রয়েছে এবং সেই অর্থ ব্যবহার করে দেশের কোথাও কোথাও নাশকতা বা অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হতে পারে বলে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে জানান তিনি।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এ ধরনের তৎপরতার সঙ্গে সাম্প্রতিক পোশাকশিল্পের সহিংসতার যোগসূত্র থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের জন্য ডিসেম্বরে বিশেষ কোনো পরিস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন তথ্য উপদেষ্টা।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ডিসেম্বর আসুক, ডিসেম্বর শেষ হোক। এরপর আমরা নিশ্চয়ই আবার এ কথা বলবো।’

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তথ্য উপদেষ্টা উল্লেখ করেন যে, শেখ হাসিনা যদি সত্যিই ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসেন, তাহলে নিজের পূর্ববর্তী মূল্যায়ন ভুল ছিল বলে তিনি স্বীকার করবেন এবং ক্ষমাও চাইবেন।

এ প্রসঙ্গে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থানের কথা স্মরণ করে ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, ওই নির্বাচনে পরাজয়ের পর শেখ তৎকালীন সরকারকে একদিনের জন্যেও শান্তিতে থাকতে না দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন।

তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘১৯৯১ সালে তিনি যদি ওই কথা বলতে পারেন, তাহলে এখন আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবেন, এটা আমরা বিশ্বাস করি না।’ তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনা ভবিষ্যতেও সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাতে পারেন, তবে বর্তমান সরকার এ ধরনের প্রচেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করবে।

শেখ হাসিনা নিজে ফিরুন বা ফিরিয়ে আনা হোক, সরকারের চাওয়া একই রয়েছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা। তার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার তার দেশে ফেরার পথ বন্ধ করতে চাইছে না, বরং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনাই সরকারের মূল লক্ষ্য। তিনি যোগ করেন, ‘উনি নিজে আসুন অথবা আমরা উনাকে ধরে নিয়ে আসি, আমাদের চাওয়া তো একই।’

বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ভারতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে এবং সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেও এখন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেরই নাগরিক এবং তিনি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চাইলে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, তা সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি তৈরি হলেই কেবল বিবেচনা করা হবে।

এ বিষয়ে আগাম সব সিদ্ধান্ত একেবারে নির্দিষ্ট করে আটকে রাখা হয়নি বলেও জানান তিনি।

বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধীদের বিরুদ্ধে যেভাবে দমনপীড়নমূলক কায়দায় অভিযোগ আনা হতো, বর্তমান সরকারের বক্তব্যকে একইভাবে দেখা একেবারেই ঠিক হবে না।

তিনি মনে করিয়ে দেন যে, একটি স্বৈরাচারী সরকার এবং একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাজের ধরন ও আচরণের মধ্যে স্পষ্ট ও মৌলিক পার্থক্য থাকবে। সরকারের বক্তব্য যদি কোনো কারণে মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে তার পরিণতিও এই সরকারকে বহন করতে হবে। সে কারণেই প্রতিটি কথা দায়িত্বশীলভাবে এবং তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আন্দোলন দমনে আগের মতো বলপ্রয়োগ করতে চায় না সরকার জানিয়ে পোশাকশিল্পের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার কথা তুলে ধরে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, পুলিশকে এমন বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। শেখ হাসিনার সরকারের সময় যেভাবে আন্দোলন দমনে নির্বিচারে শক্তি প্রয়োগ করা হতো, বর্তমান সরকার সেই পুরোনো ও অমানবিক পদ্ধতিতে আর ফিরে যেতে চায় না।

তিনি আরও বলেন, পুলিশের বলপ্রয়োগের আইনি ক্ষমতা নির্দিষ্ট রয়েছে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রশ্নও আসতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রেই আইনের সঠিক বিধান, পরিস্থিতির প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিক বলপ্রয়োগের নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আন্দোলনে যারা অংশ নিচ্ছেন, তারা প্রত্যেকেই এই রাষ্ট্রেরই নাগরিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব পালনের সময় এই বিষয়টি সর্বাগ্রে মাথায় রাখা উচিত। তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করে বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পোশাকশিল্পের বর্তমান চলমান অস্থিরতা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

তথ্য উপদেষ্টা পরিশেষে বলেন, প্রকৃত শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনের যে নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়টি যদি তাদের ভালোভাবে বোঝানো সম্ভব হয়, তবে তারা নিজেরাই আন্দোলন থেকে সরে আসবেন। তখন অন্য কোনো সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর পক্ষে সেই যৌক্তিক আন্দোলনকে ব্যবহার করে সহিংসতা বা নাশকতা চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।