নিজস্ব প্রতিবেদক:
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকাসহ বিভিন্ন দাবিতে টানা পঞ্চম দিনের মতো ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে তৈরি পোশাক শ্রমিকরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার একপর্যায়ে সাভারের হেমায়েতপুর ও উলাইলে পুলিশের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে সাভারের হেমায়েতপুর ও উলাইল এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়, যা পরবর্তীতে তীব্র আকার ধারণ করে।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনায় পুলিশ, শ্রমিক ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৪০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
আহতদের সঠিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানা গেছে যে, সংঘর্ষের সময় সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলমসহ মোট সাতজন পুলিশ সদস্য এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তিনজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।
আহত সংবাদকর্মীদের পরিচয় নিশ্চিত করে জানানো হয়েছে যে, এই সহিংসতায় আহত হওয়া সাংবাদিকরা হলেন ৭১ টেলিভিশনের রায়ইন ও উজ্জল এবং স্টার নিউজের সিরাজি।
সাভারের হেমায়েতপুরে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করাসহ বিভিন্ন যৌক্তিক দাবিতে টানা পঞ্চম দিনের মতো ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ তৈরি পোশাক শ্রমিকরা।
সকালে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে মহাসড়কে এসে অবস্থান নেন এবং তীব্র বিক্ষোভ শুরু করলে মুহূর্তের মধ্যে ব্যস্ত এই মহাসড়কের উভয় লেনে সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের অন্যান্য সুনির্দিষ্ট দাবির মধ্যে রয়েছে চলমান এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কোনো শ্রমিককে যেন মালিকপক্ষ বা প্রশাসন কালো তালিকাভুক্ত না করে এবং এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়া শ্রমিকদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া।
এর আগে গত ৩ নভেম্বর বিকালের দিকেও প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে একই দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন শ্রমিকরা, পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আশ্বাসের বাণী শোনানোর পর তারা সেই অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
বুধবার উদ্ভূত এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি এড়াতে এবং বড় ধরনের সহিংসতা রোধ করতে সকাল থেকেই হেমায়েতপুর ও পদ্মার মোড় এলাকার মোট ১১টি কারখানায় কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
মহাসড়ক দীর্ঘ সময় ধরে অবরোধের কবলে থাকায় এর দুই পাশে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও বিভিন্ন দূরপাল্লার পরিবহনের চালকরা।
সকাল ১০টার দিকে হেমায়েতপুরের স্ট্যান্ডার গ্রুপের সামনে অবস্থানরত শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পালটা ধাওয়া শুরু হয় এবং পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দফায় দফায় টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে, আর এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশকে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা প্রদান করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অতিরিক্ত সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালান।
অন্যদিকে, সাভারের উলাইল এলাকায় অবস্থিত আল-মুসলিম গ্রুপের সামনেও পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক পুরোপুরি অবরোধ করে পুলিশকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন, যার জবাবে পুলিশও পালটা টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।
সংঘর্ষের এই দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ায় প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে মূল মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, ফলে স্থবির হয়ে পড়ে পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা।
সাভার মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোশাররফ হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে জানান যে, শ্রমিকদের এলোপাতাড়ি ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে ওসি সাইফুল আলমসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন এবং ওসির নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে দ্রুত সেখান থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে উত্তেজনার পারদ চড়ার একপর্যায়ে পদ্মার মোড় এলাকায় সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলমের ব্যবহৃত সরকারি পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে এলে পুনরায় মহাসড়কে সীমিত পরিসরে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
সংঘর্ষের সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের ওপর হামলার শিকার হওয়ার বিষয়ে পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান যে, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ধারণ করার সময় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তাদের ওপর চড়াও হয়ে হামলা চালান।
এদিকে সাভারের এই সহিংসতার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে আশুলিয়ায়, যেখানে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
তবে সম্ভাব্য যেকোনো সহিংসতা এড়াতে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে এবং দু-একটি কারখানার শ্রমিকরা বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশের কঠোর তৎপরতার কারণে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।











