নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জের জিনজিরা দীর্ঘদিন ধরে নকল পণ্য উৎপাদনের জন্য বেশ প্রসিদ্ধ। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এখানে নকল ট্যাং, জুস ও গ্লুকোজ তৈরির পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফার লোভে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এসব ভেজাল খাদ্য উৎপাদন করছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে মফস্বল এলাকার মানুষ মারাত্মক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
জিনজিরা, মান্দাইল, আমিরাবাগ, বোরহানিবাগ, শুভঢ্যা, আগানগর, কালীগঞ্জ ও কাজিরগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় এই অবৈধ কার্যক্রম চলছে। এখানে নামীদামী ব্র্যান্ডের মোড়ক নকল করে নকল অরেঞ্জ ও ম্যাংগো ড্রিংকস পাউডার (ট্যাং), কিটক্যাট, মিমিসহ বিভিন্ন ধরনের চকলেট তৈরি হচ্ছে। এসব পণ্য কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়াই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে, মুক্তিরবাগের এক কারখানায় কয়েকজন নারী শ্রমিক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খালি হাতে বোতলে ভেজাল জুস ভরছেন। তারা গ্লাভস বা চুল ঢাকার কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করছেন। প্রচণ্ড গরমের কারণে তারা ঘেমে একেবারে কর্দমাক্ত হয়ে পড়লেও উৎপাদন বন্ধ রাখেননি।
কারখানার ম্যানেজার শাকিল আহমেদ দাবি করেন, তাদের বিএসটিআই ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন আছে, তবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। ল্যাব টেস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে তাদের কোনো পরীক্ষাগার নেই। তিনি জানান, তাদের তৈরি ড্রিংকস পাউডার দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো হয় এবং বিক্রয় প্রতিনিধিরা সেগুলো দোকানে পৌঁছে দেন।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব নকল ও ভেজাল পণ্য স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রোজিনা আমিন জানিয়েছেন, কৃত্রিম রং ও রাসায়নিক মিশ্রিত এসব নকল ড্রিংকস লিভার ও কিডনির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং পাকস্থলী ও ফুসফুসে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি আরও ভয়াবহ, কারণ এতে অতিরিক্ত চিনি মিশ্রিত থাকে। তিনি পরামর্শ দেন, রোজাদারদের পানির চাহিদা মেটাতে এসব ক্ষতিকর জুসের পরিবর্তে ঘরে তৈরি দেশীয় ফলের শরবত পান করা উচিত।
একসময় র্যাবের ভেজালবিরোধী অভিযানের কারণে এসব নকল খাদ্য উৎপাদন কারখানা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা আবারও সক্রিয় হয়েছে। কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর শাহিনুর রহমান জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি অবৈধ কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে, তবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া তারা অভিযান পরিচালনা করতে পারছেন না।
কেরানীগঞ্জের ইউএনও রিনাত ফৌজিয়া জানিয়েছেন, ভেজাল খাদ্য উৎপাদন একটি বড় অপরাধ এবং দ্রুত এসব নকল খাদ্য উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোক্তাদের উচিত নকল পণ্য এড়িয়ে চলা এবং কেনার আগে বিএসটিআই অনুমোদনের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া। প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে এই ভেজাল খাদ্য উৎপাদনকারীরা জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করতে না পারে। যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে জনস্বাস্থ্যের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।











