আন্দোলন প্রত্যাহার, রোববার থেকে ক্লাসে ফিরছেন খুবির শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

তিন দফা দাবিতে চলমান আন্দোলন ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে সন্তোষজনক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করে রোববার (২ আগস্ট) থেকে সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালুর আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তবে দাবিগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে আবারও কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

 

শুক্রবার (৩১ জুলাই) শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এতে বলা হয়, তিন দফা দাবির বিষয়ে প্রশাসনের ধারাবাহিক পদক্ষেপ ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দাবিগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখবেন শিক্ষার্থীরা।

 

এর আগে ২৩ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন তারা। কয়েক দফা বৈঠকের পরও সন্তোষজনক অগ্রগতি না হওয়ায় প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনে তালা দেওয়া হয়। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে তালা খুলে দেওয়া হলেও ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি অব্যাহত থাকে।

 

শিক্ষার্থীদের প্রথম দাবি ছিল বিজয় ২৪ হলে ক্যানটিনকর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা গোপনে ভিডিও ধারণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ঘটনার আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার অভিযোগে হল প্রভোস্ট বডিকে জবাবদিহির আওতায় আনা।

 

শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে চারটি ধারায় মামলা করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে আছেন। আদালতের রায়ের ভিত্তিতে শাস্তির প্রক্রিয়া হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালত পর্যন্ত যাওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।

 

হল প্রভোস্ট বডির ভূমিকা তদন্তে গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করতে পারবেন এবং এ বিষয়ে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে অবগত থাকবেন বলেও জানানো হয়েছে।

 

দ্বিতীয় দাবিতে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনসার এবং এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩৭তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনসারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, নিপীড়ন ও নির্যাতনবিরোধী কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

 

তৃতীয় দাবিটি ছিল ‘স্পন্দন ২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্লাবটির বিতর্কিত কমিটি বিলুপ্ত করে এর সব কার্যক্রম আজীবনের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। রোববার ছাত্রবিষয়ক পরিচালকের দপ্তরে ক্লাবটির নিবন্ধন বাতিলের আবেদন জমা দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।

 

এদিকে আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ২২ জুলাই রাতে বিজয় ২৪ হলের ছাত্রীদের শৌচাগার ও গোসলখানার ভেন্টিলেটর দিয়ে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। শিক্ষার্থীরা ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। একই ঘটনায় তার স্ত্রীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

 

এরপর ওই ঘটনার বিচার, যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ‘স্পন্দন ২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। টানা কর্মসূচির মধ্যে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক, তদন্ত কার্যক্রম এবং সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের পর দাবিগুলোর ক্ষেত্রে সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দিন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং যেসব বিষয় তদন্তাধীন রয়েছে, সেগুলোও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলছে।”

 

শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক ও শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে নেওয়া হবে।

 

শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে থাকবেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের গড়িমসি বা অসহযোগিতামূলক আচরণ দেখা গেলে আবারও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

 

ফলে রোববার (২ আগস্ট) থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার কথা রয়েছে।