আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন ও চক্রান্ত দেখছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ার তৈরি পোশাকশিল্প এলাকায় চলমান শ্রমিক আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন এবং দেশি-বিদেশি গভীর চক্রান্ত রয়েছে বলে জোরালো দাবি করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের স্পষ্ট অভিযোগ, শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করলেও একটি মহল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ব্যক্তি এবং পর্দার আড়ালে থাকা তাদের ইন্ধনদাতাদের সম্পর্কে পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট ও পাকা গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। উদ্ভূত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেসব জায়গায় সহিংসতা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং তাদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনার হুংকার দিয়েছেন তারা। ইতিমধ্যে এই ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হলেও পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের মোট সংখ্যা গণমাধ্যমকে জানানো হয়নি।

গত সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলে শিল্পাঞ্চলের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরজমিন পরিদর্শন শেষে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উলাইল এলাকায় অবস্থিত আল মুসলিম গ্রুপের কারখানার সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে এই কথাগুলো বলেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোস্তাফিজুর রহমান এবং ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন।

শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠনের পরও কেন আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে এবং এর পেছনে আসলেই কোনো তৃতীয় পক্ষের হাত রয়েছে কি না—এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তার আগের দিন সকালেই সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং বর্তমানে সেই বোর্ডের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চলমান রয়েছে।

আন্দোলনরত শ্রমিকদের দ্রুত নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সাধারণ শ্রমিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পুলিশ মাঠপর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা পরিকল্পিতভাবে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিবেশ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। পোশাক খাতের শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়টি তাদের এজেন্ডায় নেই, বরং তাদের উদ্দেশ্য অন্য কোনো মহলের স্বার্থ উদ্ধার করা। কোনো অবস্থাতেই তাদের সেই অসৎ উদ্দেশ্য সফল হতে দেওয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত আইনের সীমার মধ্যে থেকে যা যা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, পুলিশ তার সবটুকুই গ্রহণ করবে।

অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী দুষ্কৃতকারী ও তাদের নেপথ্যের ইন্ধনদাতাদের বিষয়ে পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ করে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এই সংক্রান্ত যথেষ্ট তথ্য ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাণ্ডারে জমা রয়েছে। যারা কারখানার শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করবেন, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

চলমান আন্দোলন ঘিরে ইতোমধ্যে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ কিংবা সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মী জড়িত রয়েছে কি না—এমন এক কৌতূহলী প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি স্পষ্ট জানান, গ্রেফতারকৃত প্রতিটি ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অত্যন্ত গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তারা যে দলেরই অনুসারী হোন না কেন, শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির সঙ্গে যারাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রমাণিত হবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

অন্যদিকে, আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে মাথায় হেলমেট ও মুখে মুখোশ পরে বিশৃঙ্খলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার অগ্রগতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে এসপি শামীমা পারভীন বলেন, এই নাশকতাকারীদের একটি বড় অংশকে ইতিমধ্যে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে এবং এ বিষয়ে পুলিশের হাতে পাকা গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই যে হেলমেট বাহিনী নামে পরিচিত একটি চক্র, আপনারা গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখেছেন এই হেলমেট বাহিনী আসলে কারা ছিল। আমরা সেই সুনির্দিষ্ট হেলমেট বাহিনী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত রয়েছি এবং তাদের পাকড়াও করতে আমাদের অভিযান চলছে।

পুলিশ সুপার আরও জানান, পুরো আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন পয়েন্টে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজ, গণমাধ্যমকর্মীদের সংগ্রহ করা ভিডিও ক্লিপ এবং পুলিশের নিজস্ব বিশেষ গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তার এই জোরালো দাবি, মূলত সাধারণ ও আন্দোলনরত প্রকৃত শ্রমিকদের ভিড়ের মধ্যে সুকৌশলে অনুপ্রবেশ করে কিছু দুষ্কৃতকারী ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের অপরাধী ব্যক্তিদের পুলিশ কখনোই প্রকৃত শ্রমিক হিসেবে গণ্য করছে না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আসলে যারা রাতের আঁধারে বা দিনের আলোতে কারখানা ভাঙচুর করে, তারা জীবনেও প্রকৃত শ্রমিক হতে পারে না। কারণ একজন সাধারণ শ্রমিক কখনোই নিজ হাতে তার রুটি-রুজির উৎসস্থল নিজের প্রতিষ্ঠান বা নিজের গার্মেন্টস ভাঙচুর করতে পারে না।

পুলিশ সুপারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সাধারণ শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের ভিড়ে মিশে কিছু কুচক্রী ব্যক্তি মূলত গোটা দেশকে অস্থিতিশীল করার হীন উদ্দেশ্যে এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এই দুর্বৃত্তদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের বিশেষ অভিযান ও তৎপরতা এখনো পুরোদমে অব্যাহত রয়েছে।

চলমান শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাভার ও আশুলিয়ার পুরো শিল্পাঞ্চলে আরও বড় কোনো নাশকতামূলক পরিকল্পনা বা নাশকতা ঘটানোর গভীর ষড়যন্ত্র ছিল বলে দাবি করেছেন পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন। তার ভাষ্যমতে, পুলিশের কাছে থাকা আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সময়মতো সাঁড়াশি অভিযান ও ত্বরিত গ্রেফতারসহ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার কারণেই সেই বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেনি।

তিনি আরও যোগ করেন, সাভার, আশুলিয়া, ইপিজেড এবং হেমায়েতপুর এলাকায় বর্তমানে ছোট-বড় অনেক পোশাক কারখানা চালু রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে শিল্পকারখানায় যেভাবে অবাধে ভাঙচুর ও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির নজির রয়েছে, এবার পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় অতীতের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।

চলমান এই অনাকাঙ্ক্ষিত শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে ঠিক কতটি পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে কিংবা কতটি কারখানায় মালিকপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে, সেই সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটি তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি পুলিশ সুপার।

তবে তিনি পরিষ্কার করে বলেন, যেসব কারখানা এই মুহূর্তে বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ নিজেদের ব্যবসায়িক ও ব্যবস্থাপনাগত সিদ্ধান্তে ছুটি ঘোষণা করেছে। আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার কোনো ধরনের মারাত্মক ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে—এমন কোনো নাজুক পরিস্থিতি এই মুহূর্তে তৈরি হয়নি বলেও তিনি জোরালো দাবি জানান।

শামীমা পারভীন আরও জানান, গত সোমবার সকাল থেকেই ঢাকা জেলা পুলিশ পুরো শিল্পাঞ্চলজুড়ে নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। বিশেষ করে আশুলিয়া, ইপিজেড ও সাভারের সমস্ত পোশাক কারখানার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশের এই দৃশ্যমান ও জোরালো তৎপরতার কারণেই ওই দিন কোনো কারখানার ওপর নতুন করে হামলার বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার বিন্দুমাত্র সুযোগ তৈরি হয়নি।

শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ এবং তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের অন্যান্য প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় সাধন করেই মূলত এই যৌথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সব কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং শ্রমিকদের আশ্বস্ত করে কাজে যোগ দেওয়ার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

পুলিশ সুপার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, তৈরি পোশাকশিল্পের মতো একটি বিশাল খাতের সঙ্গে লাখ লাখ সাধারণ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা এবং তাদের পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এছাড়া জাতীয় অর্থনীতিতেও এই রপ্তানিমুখী খাতের অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাই যেকোনো মূল્યે শিল্পাঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি।

চলমান এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঠিক কতজনকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন যে, ঢাকা জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ, আশুলিয়া এবং সাভার থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক বিশেষ ইউনিট বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন গোপন ও প্রকাশ্য স্থান থেকে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিম আলাদাভাবে ও একযোগে অভিযান পরিচালনা করায় তাৎক্ষণিকভাবে সব প্রান্ত থেকে মোট গ্রেফতারের সংখ্যা একত্র বা সমন্বয় করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, পুলিশের সকল ইউনিটের মাঠপর্যায়ের তথ্যগুলো একত্র করে খুব দ্রুতই সন্ধ্যার মধ্যে গ্রেফতারকৃতদের মোট সংখ্যা সংবাদমাধ্যম কর্মীদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

বিভিন্ন কারখানার সাধারণ শ্রমিকেরা স্বেচ্ছায় নিজ দায়িত্বে কাজে যোগ দিতে ইচ্ছুক থাকলেও বাইরের কিছু স্বার্থান্বেষী ও বহিরাগত ব্যক্তি তাদের নানাভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন বহু অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সুপার স্পষ্ট ভাষায় শ্রমিকদের যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য অত্যন্ত আন্তরিকভাবে আহ্বান জানান।

তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমাদের সম্মানিত শ্রমিক ভাই-বোনারা, আপনারা দয়া করে কোনো ধরনের কুচক্রী মহলের পাতা ফাঁদে পা দেবেন না। যারা আপনাদের প্রতিনিয়ত উসকে দিচ্ছে, সেই উসকানিদাতাদের কোনো প্ররোচনায় কান দেবেন না। কারণ এই তৈরি পোশাক কারখানা ও উৎপাদনই হচ্ছে আপনাদের একমাত্র রুটি-রুজির উৎস। আপনারা নিরাপদে নিজের কর্মে ফিরে যান, মনোযোগ দিয়ে কাজ করুন। আপনাদের এবং আপনাদের কারখানার পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করার শতভাগ দায়িত্ব আমাদের ওপর ছেড়ে দিন।

পুলিশের মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের একাংশের বিরুদ্ধে সম্প্রতি উত্থাপিত নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, পুলিশ অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আকস্মিক অবনতি রোধে অনেক সময় মাঠের কর্মকর্তাদের অত্যন্ত কৌশলগত ও পরিপক্ব সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেটিকে কোনোভাবেই কোনো ধরনের নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে দেখার বা ব্যাখ্যা করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

তিনি পরিষ্কার করে বলেন, আমাদের মাঠপর্যায়ের মূল কাজ হচ্ছে এই বিশাল গার্মেন্টস শিল্পকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে আমাদের সাধারণ শ্রমিক ভাইদের সার্বিক সুরক্ষা প্রদান করা।

পুলিশ সুপার আরও একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বলেন, অনেক সময় কোনো নির্দিষ্ট পয়েন্টে পাঁচ থেকে ছয় শ’ বিক্ষুব্ধ শ্রমিকের বিপরীতে মাত্র বিশ জন পুলিশ সদস্যকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেই মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণহানি বা বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে পুলিশকে অত্যন্ত সুকৌশলী অবস্থান নিতে হয়। পুলিশের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কখনো কোনো নাগরিক বা শ্রমিককে আহত করা নয়; বরং সাধারণ শ্রমিক ও শিল্পকারখানা উভয়ের জীবন ও সম্পত্তির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর ঠিক এই কারণেই সব সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে পুলিশ কখনো আক্রমণাত্মক বা মারমুখী অবস্থান গ্রহণ করে না বলেও তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে বলেন।

দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্যের অতর্কিত হামলায় আহত হওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সেদিনের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক ভালো ও নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবুও যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শিল্পাঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে কিংবা এই ধরনের নাশকতায় পেছন থেকে ইন্ধন জোগাবে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শূন্য সহিষ্ণুতা (জিরো টলারেন্স) নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে এবং ছাড় দেওয়া হবে না।

সরকার কর্তৃক মজুরি বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার পরও শ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলন এবং সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পেছনে গভীর কোনো দেশি-বিদেশি চক্রান্ত রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাধারণ শ্রমিকদের নায্য দাবির প্রতি সরকারের চরম আন্তরিকতার বাস্তব প্রমাণ হিসেবেই কিন্তু এই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এত কিছুর পরও যারা বিনা কারণে কারখানায় ভাঙচুর ও বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে, স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনের নেপথ্য অন্য কোনো মহলের গভীর ও অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে পুলিশ জোরালোভাবে সন্দেহ করছে।

পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের সুনির্দিষ্ট দাবি, দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে চরম অস্থিতিশীল করে তোলার একটি সুদূরপ্রসারী দেশি-বিদেশি চক্রান্ত বর্তমানে এই শিল্পের পেছনে সক্রিয় রয়েছে বলে তাদের কাছে শক্ত ধারণা রয়েছে। এই বিষয়ে পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্যও রয়েছে এবং সেই গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পুলিশের মাঠপর্যায়ের দলগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে যাচ্ছে।

তবে এই কথিত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক কোন কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা চক্র সরাসরি জড়িত রয়েছে, তাদের আসল পরিচয় কী কিংবা এই বিষয়ে পুলিশের হাতে ঠিক কী ধরনের গোপন তথ্য রয়েছে, তার কোনো বিস্তারিত বিবরণ বা নাম-পরিচয় সেই মুহূর্তে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে বা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা।