অনলাইন ডেস্ক:
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির দীর্ঘদিনের জনসমক্ষে অনুপস্থিতি দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তার এই অনুপস্থিতি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য ক্রমেই একটি বড় রাজনৈতিক দায়ে পরিণত হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার এক সপ্তাহ পর মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকে প্রকাশ্যে কোথাও দেখা যায়নি।
এমনকি সাবেক সর্বোচ্চ নেতার জানাজা ও দাফান অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তার পক্ষ থেকে কোনো লিখিত বার্তাও প্রকাশ করা হয়নি, যা দেশটির জনগণের মধ্যে তার অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নানা জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা জ্যেষ্ঠ কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, হামলায় মোজতবা খামেনি মুখমণ্ডলে গুরুতর আঘাত পান এবং আহত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত থাকলেও এখনো জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়ার মতো শারীরিকভাবে সুস্থ নন।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর তার স্বাস্থ্য ও নেতৃত্বের সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ইসফাহানের ৪৭ বছর বয়সী এক দোকানদার তাগি রয়টার্সকে বলেন, “নিরাপত্তার কারণে তিনি জনসমক্ষে না আসতেই পারেন। কিন্তু দেশ এখন কঠিন সময় পার করছে। মানুষ অন্তত দেখতে চায় যে দেশের একজন নেতা আছেন এবং তিনিই রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।”
পারিবারিক উপস্থিতি, কিন্তু নেই নতুন নেতা
সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির দাফান অনুষ্ঠানে তার অপর তিন ছেলে কফিনের পাশে জানাজার নামাজে অংশ নেন। তবে মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি ছিল স্পষ্ট।
তার পরিবর্তে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি আলি খোমেনি শুক্রবারের শোকানুষ্ঠানে মোজতবার প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ধর্মীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অনেকের ধারণা ছিল, অন্তত বাবার দাফান উপলক্ষে মোজতবা খামেনির একটি ভিডিও বার্তা, ছবি কিংবা অডিও প্রকাশ করা হবে। কিন্তু তা হয়নি।
ইরানের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং শারীরিক অবস্থার কারণেই এখন পর্যন্ত তার কোনো নতুন ছবি বা বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।
নিরাপত্তা ও নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ
মার্চের শুরুতে ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। তবে এখনো তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে সর্বশেষ সরকারি তথ্য এসেছে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের কাছ থেকে। মে মাসে তিনি জানান, মোজতবার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে এবং তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
যদিও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বর্তমানে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, তবুও একজন সর্বোচ্চ নেতা কতদিন জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকতে পারেন-সে প্রশ্ন উঠছে।
স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ইতিহাসের অধ্যাপক আলি আনসারি বলেন, “যে উত্তরসূরিকে কেউ দেখতেই পাচ্ছে না, তার চারপাশে কীভাবে ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে? স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই নয়।”
আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ২০ জনের বেশি ইরানি নাগরিক জানিয়েছেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে।
তেহরানের ৫১ বছর বয়সী শিক্ষক মোহাম্মদরেজা বলেন, “যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি দেশের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়াবে।”
ইরানে সর্বোচ্চ নেতার পদ শুধু রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ অনুযায়ী, তিনি শিয়া ইসলামের দ্বাদশ ইমামের প্রতিনিধিত্ব করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনির ধর্মীয় মর্যাদা তার বাবা বা ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মতো শক্তিশালী নয়। তিনি নিজেও বড় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। বরং দীর্ঘদিন বাবার দপ্তর পরিচালনা এবং দেশজুড়ে প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক তদারকির পাশাপাশি রেভল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
তবে তার রাজনৈতিক দর্শন, নেতৃত্বের ধরন ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভের পর ইরান যখন কঠিন সময় পার করছে, তখন দেশের সর্বোচ্চ নেতার দীর্ঘ অনুপস্থিতি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
তথ্যসূত্র: রয়াটার্স











