অনলাইন ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনসহ কেনিয়া থেকে দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনাম—বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গোপনে প্রচারণা চালানো এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভারতের বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া পরিচয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট, বট ও নানা বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে কৃত্রিম জনমত তৈরির কাজে লিপ্ত রয়েছে এই চক্রগুলো।
কাতারভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে জানা যায়, ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাটের আহমেদাবাদের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে বসে ২০২২ সালের কেনিয়া নির্বাচনে উইলিয়াম রুটোর পক্ষে প্রচারণামূলক কনটেন্ট তৈরি করতেন ২২ বছর বয়সী রাজন কুমার। সে সময় প্রতিদিন মাত্র ৭ ডলারের বিনিময়ে তাকে পোস্টার তৈরি ও ভিডিও সম্পাদনার কাজ করতে হতো। তবে তার তৈরি করা এসব কনটেন্ট রুটোর আনুষ্ঠানিক প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ করা হতো না; বরং পরিচয় গোপন রাখা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেওয়া হতো, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে মনে হয় এগুলো স্বতন্ত্র কোনো ব্যবহারকারীর নিজস্ব মতামত।
কুমারের বর্ণনা অনুযায়ী, বিরোধী নেতাদের বক্তব্যের অংশবিশেষ সুকৌশলে কেটে এমনভাবে উপস্থাপন করা হতো যাতে তাদের মূল বক্তব্যের অর্থ সম্পূর্ণ বদলে যায়। পাশাপাশি, কোনো প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনী সম্ভাবনা নিয়ে মিথ্যা দাবি সংবলিত পোস্টার তৈরির কাজও করা হতো। এমনকি নারী রাজনীতিকদের সম্মান ক্ষুণ্ন করতে তাদের সঙ্গে অন্য ব্যক্তির সম্পর্কের নানা রকম গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশলও সেই সময় ব্যবহার করা হতো বলে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী মাঠেও এই চক্রের সক্রিয় উপস্থিতি এবং ছায়া প্রচারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুরুর আগেই ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক প্রচারণায় বেশ সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতে দেখা গেছে। গত ৪ আগস্ট মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রাইমারি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই রাজনীতিক হ্যালি স্টিভেনসের পক্ষে এ ধরনের গোপন প্রচারণার তথ্য প্রথম প্রকাশ্যে আনে নিউইয়র্ক টাইমস। সেবারের সেই প্রাইমারি নির্বাচনে তিনি শেষ পর্যন্ত আবদুল এল-সাইয়েদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।
অনলাইনে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা পর্যবেক্ষণকারী বিশিষ্ট গোষ্ঠী ‘অ্যাবসলুটফোরনাভালনি’ (মূল প্রতিবেদনে অ্যান্টিবট৪নাভালনি) গণমাধ্যমটিকে জানিয়েছে, হ্যালি স্টিভেনসের পক্ষে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া অন্তত ২৮টি সমন্বিত অ্যাকাউন্টের সন্ধান পেয়েছে তারা। এই পোস্টগুলো সব মিলিয়ে ৭০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। পরবর্তীতে ওই গণমাধ্যমের নিজস্ব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শনাক্ত করা ওই অ্যাকাউন্টগুলোর অন্তত ১৫টিই সরাসরি ভারত থেকে পরিচালিত হচ্ছিল।
একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া ফরেনসিক হাবের গবেষকেরাও স্টিভেনসের পক্ষে ভারতীয় অ্যাকাউন্ট ও পেজ ব্যবহার করে চালানো একই রকম প্রচারণার জোরালো তথ্য উদ্ধার করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় নানা ধরনের বিতর্কিত বা অতিরঞ্জিত কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এসব রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু চতুর কৌশল অবলম্বন করে থাকে। কখনো তারা আগে থেকেই চালু থাকা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, কখনো আবার সম্পূর্ণ নতুন পেজ খুলে বসে, কিংবা অন্য কারো মালিকানাধীন পেজ ভাড়ায় নিয়ে কাজ চালায়। এসব পেজের মাধ্যমেই এমন সব প্রচারণা চালানো হয়, যা কোনো রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি প্রকাশ করা কদাচ সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিজস্ব নীতিমালায় ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, অ্যাকাউন্ট কেনাবেচা এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের আসল অর্থদাতার পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখার ওপর পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ভারতীয় এই পরামর্শকেরা বিভিন্ন কৌশলে নিয়মের সেই সব ফাঁকফোকর গলিয়ে দিব্যি নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রয়োজনে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের নাগরিক পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজও করা হয়।
অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রেও প্রচলিত নিয়ম এড়িয়ে সম্পূর্ণ গোপন পদ্ধতি অবলম্বনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পরামর্শক জানিয়েছেন, বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে সম্পূর্ণ ভুয়া কাজের চুক্তিপত্র দেখিয়ে অর্থ পাঠানো হয়। এছাড়া প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে হুন্ডি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সীমান্ত পেরিয়ে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করা হয়।
আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতের অন্যতম রাজনৈতিক পরামর্শক তুষার গিরি দাবি করেছেন যে, ভারত বর্তমানে গোপন রাজনৈতিক প্রচারণার এক বিশাল ও লাভজনক বাজারে পরিণত হয়েছে। অত্যন্ত কম খরচে ভারত বসেই বিশ্বের যেকোনো দেশের জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব বিস্তারের প্রচারণা সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, কেনিয়া ছাড়াও নেপাল, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির মতো বিভিন্ন দেশে ভারতীয় রাজনৈতিক পরামর্শকদের তৎপরতা ও কাজের তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি সুরিনামের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণামূলক কার্যক্রমেও যুক্ত হওয়ার জন্য ভারতীয় পরামর্শকদের সঙ্গে পূর্বে আলোচনা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই ধরনের সমস্ত গোপন ও অবৈধ কার্যক্রমের পেছনে মারাত্মক বড় ধরনের ঝুঁকিও লুকিয়ে রয়েছে। এর বড় প্রমাণ মেলে ২০২২ সালের কেনিয়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে; সে সময় উইলিয়াম রুটোর প্রচারণায় কাজ করা দুই ভারতীয় পরামর্শক জুলফিকার আহমেদ খান ও মোহাম্মদ জায়েদ সামি কিদওয়াই নাইরোবি শহরে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। পরবর্তীতে একই বছরের অক্টোবর মাসে তাদের নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের এই নৃশংস অপহরণের ঘটনায় কেনিয়ার একটি বিশেষ পুলিশ ইউনিটের বেশ কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। তবে পরবর্তীতে ২০২৬ সালের আগস্টে দেশটির প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক আবেদনের প্রেক্ষিতে কেনিয়ার হাইকোর্ট ওই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার সমস্ত অভিযোগ বাতিল করে দেন।











