মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আজও দুই শতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণের দাবিতে আজও গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে সকাল থেকে বিক্ষোভ করছেন পোশাক শ্রমিকরা, যার ধারাবাহিকতায় আশুলিয়া, সাভার ও রাজধানীর মিরপুরেও চলছে বিক্ষোভ এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা।

শিল্প পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২১০টির মতো পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে গাজীপুরেই ১৫০টি এবং সাভার-আশুলিয়া শিল্প অঞ্চলে প্রায় ৬০টির মতো কারখানা বন্ধ করা হয়েছে, যা সামনে আরও বাড়তে পারে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানান যে আজ ১৫০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলমান রয়েছে।

সকাল থেকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করায় কোনাবাড়ী, সফিপুর ও মৌচাক এলাকার কারখানার শ্রমিকরাও মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন, যার ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে উভয় পাশে অন্তত ১০ কিলোমিটার এলাকজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে এবং পুলিশ সুপার নিশ্চিত করেছেন যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত তৎপরভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

এদিকে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে সকাল থেকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে এবং একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সংঘর্ষ ও উত্তেজনার জেরে শিল্পাঞ্চলের অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ, যদিও আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান যে শ্রমিক ও কারখানা মালিকদের সঙ্গে কথা বলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটি এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।

পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেন যে শিল্পাঞ্চলের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে পুলিশ কাজ করছে।

উল্লেখ্য যে গতকাল রবিবারও গাজীপুর, আশুলিয়া ও সাভারে তিন শতাধিক কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছিল।

অন্যদিকে রাজধানীর মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১২ নম্বর পর্যন্ত প্রধান সড়কে পোশাক শ্রমিকরা উপস্থিত থাকলেও গতকালের সংঘর্ষের পর আজ তারা সড়ক অবরোধ না করায় যান চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে থেকে মিরপুর-১০ ও কাফরুল থানা এলাকা থেকে মোট ছয়জনকে আটক করেছে, যদিও সকালে মিরপুর-১১ নম্বরে পুলিশের সঙ্গে পোশাক শ্রমিকদের কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে।

আজ সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন যে শ্রমিক আন্দোলনের নামে সীমান্তের ওপারের ইশারায় দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চলছে।

শ্রমিক আন্দোলনের নামে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে তাদের কঠোর হস্তে দমন করার হুঁশিয়ারি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ, জীবনমানের উন্নয়ন এবং অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবতার নিরিখে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়েছেন।

পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিক ভাইবোনদের ব্যবহার করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছেন বলে সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আজ বিকেলে শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আবারও বৈঠকে বসবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, যেখানে চলমান আন্দোলন ও তাদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

পোশাকশিল্প এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ রাখবেন বলে আগেই সতর্ক করেছেন মালিকপক্ষ।

শিল্পাঞ্চলে চলমান অসন্তোষের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর উত্তরা অফিসে গত রবিবার অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন করে মজুরি বোর্ড গঠন হওয়ার পরও যদি শ্রমিকরা কাজে যোগ না দেন, তবে শ্রম আইনের ১৩/১ ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখা হবে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান যে মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকরা কাজ না করলে রোজ রোজ কারখানা চালু রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে এবং সে ক্ষেত্রে মালিকরা শ্রম আইনের ১৩/১ ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হবেন।

শ্রমিকরা কাজে যোগ না দেওয়ায় গত রবিবার মোট ৫২৯টি কারখানা তাদের নিয়মিত উৎপাদন কাজ চালাতে পারেনি বলেও তিনি সেই সময় নিশ্চিত করেছিলেন।