ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে চাপের মুখে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে চাপের মুখে পড়ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাকের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে ৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। তবে মে মাসে এককভাবে বাংলাদেশের পোশাক আমদানি ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বাড়লেও পাঁচ মাসের সামগ্রিক চিত্র নেতিবাচক। ওই সময়ে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার রফতানি বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ছে। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) না হলে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এফটিএ স্বাক্ষর করা সম্ভব হলে ওই ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং তৈরি পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপে হারাবে শুল্কমুক্ত বাজার-সুবিধা। আর ভারতের ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুবিধা ভোগ করবে। ফলে বাংলাদেশের জন্য আরো কঠিন হয়ে উঠবে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা। কারণ ইউরোপের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) পুরোপুরি কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ৩৬ শতাংশ এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ যদি ইউরোপের সঙ্গে এফটিএ করতে পারে তাহলে ক্ষতি অনেকটাই সামাল দেয়া সম্ভব হবে। তখন মোট রপ্তানি হ্রাস ১৬ শতাংশ এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি হ্রাস ১৯ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব হবে।

 

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে বিগত ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ৩৫৩ কোটি ৩ লাখ ডলারের পোশাক রফতানি করে। কিন্তু চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে ৩২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ২৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের পোশাক কম আমদানি করে। কিন্তু ভিয়েতনাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক রফতানি ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে ৬৩৯ কোটি ৭ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। আর আগের বছরের একই সময়ে যা ৬২৯ কোটি ৮৭ লাখ ডলার ছিলো। তাছাড়া কম্বোডিয়া থেকে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ও ভারতের রফতানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জানুয়ারি-মে সময়ে চীন থেকে পোশাক রফতানি ৪২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও ভারত থেকে ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ইউরোপের এফটিএ বাংলাদেশের ওপর প্রতিযোগিতামূলক চাপ বাড়াচ্ছে। কারণ ওসব চুক্তির ফলে প্রতিদ্বন্দ্বি দেশগুলো শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেলেও বাংলাদেশ এলডিসি-উত্তর সময়ে হারাবে ওই সুবিধা। তাতে ইউরোপে দ্বৈতভাবে অগ্রাধিকার হারানোর ঝুঁকি বাড়বে। আর চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী দেশ ছিলো। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলো বাংলাদেশ। যদিও মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ইতিবাচক ছিলো। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বেড়ে ৫৪ কোটি ৮৮ লাখ থেকে ৫৮ কোটি ২০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। আর বিশ্বব্যাপী মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি বেড়েছে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

 

সূত্র আরো জানায়, ইউরোপ-ভিয়েতনাম মুক্তবাণিজ্য চুক্তির কল্যাণে ২০২৭ সালের মধ্যে ভিয়েতনামের সব পণ্যে ইইউর শুল্ক পুরোপুরি শূন্যে নেমে আসবে। পাশাপাশি ইউরোপ-ভারত এফটিএ চালু হলে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া ও জুতার মতো প্রধান খাতগুলোতে ভারত শুল্কমুক্ত বাড়তি সুবিধা পাবে। বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি হিসেবে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে, উত্তরণের পর তা আরো তিন বছর বহাল থাকবে। তারপর ইইউর বাজারে বাংলাদেশকে নিয়মিত উচ্চ হারেই শুল্ক দিতে হবে। বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস সুবিধা পেলেও কঠোর নীতিমালার কারণে তৈরি পোশাক খাতে পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া অনিশ্চিত। বর্তমানে ইউরোপে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই নিট ও ওভেন তৈরি পোশাক। বিপরীতে ভারত ও ভিয়েতনামের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য অনেক বেশি। ওই দেশ দুটির মোট রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের অংশ মাত্র ৬ থেকে ৮ শতাংশ। বাংলাদেশের শীর্ষ ১৫টি তুলাভিত্তিক পোশাক পণ্য ইউরোপের সংশ্লিষ্ট আমদানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি দখল করে আছে। ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশকে বিশেষ করে ভিয়েতনামের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। তাছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি-মে সময়ে আমেরিকায় বাংলাদেশী পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ২ শতাংশ কমেছে। যদিও বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির গড় ইউনিট মূল্য প্রায় অপরিবর্তিত ছিলো। অর্থমূল্যের পাশাপাশি পরিমাণগত (বর্গমিটার) হিসাবেও বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক রফতানি ৬ দশমিক ২১ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে ভিয়েতনাম থেকে আমদানির পরিমাণ ৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, কম্বোডিয়া থেকে ১৮ দশমিক শূন্য ৩ ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক রফতানির অর্থমূল্য ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছে। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির পরিমাণ কমেছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

 

এদিকে বাংলাদেশ শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে ইতোমধ্যে ইইউর কাছে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে। সমপ্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত এফটিএ আলোচনা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশকে অশুল্ক বাধা দূর করা, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করার কথা বলেছে। গত ২০২৫ সালে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ইউরো। একই সময়ে ভারতের রপ্তানি বেড়ে ৪ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ইউরো এবং ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়ে ৪ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেও ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তৈরি পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ, চীন, ভারত, পাকিস্তান, মেক্সিকো ও হন্ডুরাস থেকে পোশাক রফতানি কমেছে। তবে আগামী মাসগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির গতি কিছুটা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

 

এদিকে এ বিষয়েবিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি-মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বৈশ্বিক পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছে। গত বছরের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক (রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ) কার্যকরের আশঙ্কায় অনেক ক্রেতা আগাম চালান (অ্যাডভান্স শিপমেন্ট) নিয়েছিলেন। ওই সময়ের অস্বাভাবিক উচ্চ রফতানির কারণেই চলতি বছরের পরিসংখ্যানে তুলনামূলকভাবে বড় পতন দেখা যাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো ভালো করেছে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া থেকে ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক রফতানি বেড়েছে। কারণ ওই দেশ দুটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক ইস্যুতে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এ বিষয়ে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) থাকায় প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান জানায়নি। কম্বোডিয়া বাংলাদেশের তুলনায় আরো অনুকূল শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।

 

অন্যদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, ইউরোপের সঙ্গে এফটিএ থাকায় ভারত ও ভিয়েতনাম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ এখনো ওই ধরনের চুক্তির বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি করতে না পারায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ইতোমধ্যে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে।