উপসাগরীয় মিত্রদের হস্তক্ষেপে ইরানে হামলা থেকে সরে এলেন ট্রাম্প

অনলাইন ডেস্ক:

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে ইরান বিক্ষোভকারীদের ৮০০টি নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা স্থগিত করেছে। একই সময়ে তেহরানের প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ থেকে ট্রাম্পকে সরে আসতে পারস্য উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো উদ্যোগ নেয়।

 

যুক্তরাষ্ট্র বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছে।

 

গত এক সপ্তাহে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরকার বিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। তবে সপ্তাহব্যাপী দমন-পীড়ন ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মুখে আন্দোলনের তীব্রতা কমে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

 

ওয়াশিংটন সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে এলেও, হোয়াইট হাউস বৃহস্পতিবার বলেছে, প্রেসিডেন্টের জন্য সমস্ত বিকল্প খোলা রয়েছে।

 

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আজ জানতে পেরেছেন, গতকাল যে ৮০০টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত করা হয়েছে।’

 

তিনি আরো জানান, বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকলে তার ‘ভয়াবহ পরিণতি’ হবে বলে ট্রাম্প তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

 

একই দিনে ইরানি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ট্রেজারি বিভাগ নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে।

 

ইতোমধ্যেই তেহরান তার পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পরেছে, যা অর্থনৈতিক সংকট বাড়িয়েছে এবং বিক্ষোভের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

 

নরওয়ে ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) বুধবার জানিয়েছে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী অন্তত ৩ হাজার ৪২৮ জন বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে।

 

সংস্থাটি আরও জানায়, চূড়ান্ত মৃত্যুর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

 

বুধবার ট্রাম্প বলেন, তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র থেকে আশ্বাস পেয়েছেন যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে না। একই সময়ে পারস্য উপসাগরীয় মিত্ররা তাকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে তৎপর হয়।

 

সব পক্ষের আক্রমণাত্মক ভাষা আপাতত কিছুটা কমে এসেছে বলে দেখা যাচ্ছে।

 

বৃহস্পতিবার এক জ্যেষ্ঠ সৌদি কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, সৌদি আরব, কাতার ও ওমান যৌথভাবে ট্রাম্পকে হামলা থেকে বিরত রাখতে নেতৃত্ব দিয়েছে।

 

তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে ওই অঞ্চলে ‘ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া’ ঘটতে পারে।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, পারস্য উপসাগরের তিনটি দেশ ‘দীর্ঘ, তীব্র ও শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে, যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানকে সদিচ্ছা দেখানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য রাজি করাতে পারে।’

 

আরেকজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা বৈঠক নিশ্চিত করে জানান, একই সঙ্গে ইরানকে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তার প্রতিক্রিয়া দেখবে।

 

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জাামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে হামলা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।

 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, হোয়াইট হাউসের লেভিট বলেন, ‘দেখুন, প্রেসিডেন্ট সত্যিই তার সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে প্রেসিডেন্টের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া আমি কথোপকথনের কোনো বিস্তারিত প্রকাশ করব না।’

 

এদিকে, ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে।

 

ইরানি কর্তৃপক্ষ এদেরকে ‘দাঙ্গাবাজ’ বলে অভিহিত করে এরা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট বলে দাবি করে।

তারা একই সঙ্গে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

 

মানবাধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন যে বিষয়টি ব্যাপক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পথে নিয়ে যেতে পারে।

 

-‘আজ কোনো ফাঁসি নয়’-

 

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে বৃহস্পতিবার টেলিফোনে কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

 

তিনি বলেন, ইরান ‘যে কোনো ধরনের বিদেশি হুমকির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করবে।’

 

এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।

 

বুধবার সৌদি আরব ইরানকে জানায়, সৌদি আরবের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর কোনো হামলা চালাতে দেবে না রিয়াদ।

 

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষাকারী দেশ সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ দু’টি সূত্র এএফপিকে জানায়, বুধবার ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি ফোনে সুইস জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক গ্যাব্রিয়েল ল্যুশিঙ্গারের সঙ্গে কথা বলেছেন।

 

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতির উত্তেজনা প্রশমনে অবদান রাখতে প্রস্তুত রয়েছে বার্ন।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার দেশটি ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

 

বৃহস্পতিবার ইরান ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে এ সব ঘটনা ঘটে।

বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ডাকা হয়।

 

বুধবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র হুমকি দিয়ে আসছিল যে এই বিক্ষোভে আটক ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

তেহরানের বাইরে কারাজে আটক ২৬ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানির বিষয়টি নিয়ে তার গ্রেফতারের পর থেকেই নজর ছিল সবার।

 

মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানায়, বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

তবে বৃহস্পতিবার ইরানের বিচার বিভাগ জানায়, সোলতানিকে ‘মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি।’

 

তার বিরুদ্ধে ইরানের ইসলামি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

বিচার বিভাগ আরো জানায়, তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে, আইনের বিধান অনুযায়ী তার শাস্তি হবে কারাদণ্ড।

 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, ‘আজ বা আগামীকাল কোনো ফাঁসি হবে না।’

 

এ বিষয়ে ট্রুথ সোশ্যালে মন্তব্য করে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি ভালো খবর। আশা করি, এটি অব্যাহত থাকবে!’