কুড়িগ্রামে অনুষ্ঠান শেষে স্ত্রীর সামনে পৌর কেয়ারটেকারকে হত্যা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের অনুষ্ঠান চলাকালে কুড়িগ্রাম পৌর টাউনহলে এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পৌরসভার কেয়ারটেকার মনছুরকে তার স্ত্রীর সামনেই সার্জিক্যাল কাঁচি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করেছেন এক যুবক, যা উপস্থিত লোকজনকে শিহরিত করে তোলে।
গত শনিবার (৭ নভেম্বর) বিকেলে জেলা শহরের কলেজ মোড় সংলগ্ন পৌর টাউনহলের প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান শেষে এই নৃশংসতা ঘটে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই স্থানীয় জনতা সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে অভিযুক্ত যুবককে হাতেনাতে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। কুড়িগ্রাম সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
নিহত পৌর কর্মচারীর নাম মনছুর (৫৮), যিনি দীর্ঘদিন ধরে কুড়িগ্রাম পৌরসভায় মুজুরিভিত্তিক কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সর্বশেষ তিনি পৌর টাউনহলে কেয়ারটেকারের পদে নিয়োজিত ছিলেন। ঘটনার দিন দুপুরে প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান শেষে তার স্ত্রী মল্লিকা (৪৮) স্বামীর জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে টাউনহলে পৌঁছান। ঠিক সেই মুহূর্তে শাহনেওয়াজ সানি নামের এক যুবক কোনো কারণ ছাড়াই সার্জিক্যাল কাঁচি দিয়ে মনছুরের ওপর চড়াও হন এবং তাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেন। স্বামীর জীবন বাঁচাতে স্ত্রী মল্লিকা এগিয়ে গেলে অভিযুক্ত যুবক তাকেও ধারালো কাঁচি দিয়ে আঘাত করে জখম করেন।
অভিযুক্ত যুবকের পরিচয় নিশ্চিত করে পুলিশ জানিয়েছে, তার নাম শাহনেওয়াজ সানি (৩২) এবং তিনি শহরের সরদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা জুলহাসের পুত্র। সানির কাছে আগে থেকে কেন সার্জিক্যাল কাঁচি রাখা ছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে স্থানীয়দের ধারণা ও প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে যে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ।
টাউনহলে সে সময় উপস্থিত জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীরা জানান, শনিবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রথম পর্বের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর আমন্ত্রিত অতিথি ও সাধারণ অংশগ্রহণকারীরা একে একে প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই ওই অভিযুক্ত যুবক টাউনহলের ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন পৌর কর্মচারী মনছুর তাকে জানান যে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে, তাই এই মুহূর্তে ভেতরে প্রবেশ করার কোনো প্রয়োজন নেই। এই সাধারণ কথাটিকে কেন্দ্র করেই মনছুরের সঙ্গে ওই যুবকের তীব্র বাগবিতণ্ডা শুরু হয়।
ঠিক একই সময়ে মনছুরের স্ত্রী টিফিন ক্যারিয়ারে করে স্বামীর দুপুরের খাবার নিয়ে টাউনহল চত্বরে পা রাখেন। মনছুর যখন তার স্ত্রীর হাত থেকে খাবার নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ওই যুবক আকস্মিক আক্রমণ করে মনছুরের বুকে ধারালো কাঁচি দিয়ে একাধিক আঘাত হানেন। স্বামী রক্ষার্থে তার স্ত্রী বাধা দিতে গেলে হামলাকারী তাকেও রেহাই দেননি, তাকেও কাঁচি দিয়ে আঘাত করেন। মনছুর ও তার স্ত্রীর আর্তচিৎকারে টাউনহলের ভেতরে থাকা অন্যান্য কর্মচারীরা দ্রুত ছুটে এসে তাদের উদ্ধার করেন এবং চিকিৎসার জন্য কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করেন। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মনছুরকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, এই হামলায় গুরুতর আহত স্ত্রীর উন্নত সুচিকিৎসার সুব্যবস্থার জন্য তাকে তাৎক্ষণিকভাবে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ঘটনার পর স্থানীয় জনতা ঘাতক যুবককে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে।
এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে দ্রুত কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ছুটে যান জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথসহ পুলিশ ও পৌর প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। কুড়িগ্রাম সদর থানার ওসি কামাল হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, অভিযুক্ত যুবককে এরই মধ্যে আটক করা হয়েছে এবং তার হেফাজত থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কাঁচিটি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনায় নিহতের কন্যা নিজেই বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়েরের পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ওসি কামাল হোসেন আরও বলেন, প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে যে ঘটনাটি একেবারেই আকস্মিক, এটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নয়। ওই যুবকের কাছে কেন কাঁচি ছিল এবং কী কারণে তিনি এমন নৃশংস ঘটনা ঘটালেন, তা গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এই পৌর কর্মচারী হত্যাকাণ্ডের পরও গত শনিবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল অর্থাৎ কুড়িগ্রাম পৌর টাউনহলেই জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের দ্বিতীয় পর্বের নির্ধারিত অনুষ্ঠান সূচি অনুযায়ী চলমান ছিল।
