গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ নয়, সমস্যা সমাধানের অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় সরকার: তথ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক:

গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় সরকার বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা, আর্থিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে বর্তমান সময়ের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গণমাধ্যমের জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে।

 

মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদপত্রের কালো দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।

 

আলোচনায় ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এককভাবে কেন্দ্রীভূত হয়। পরবর্তীতে ১৬ জুন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হেনে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়, যা দেশের গণতন্ত্র ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

 

তবে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর গণমাধ্যমের সংকটের ধরন বদলে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “তৎকালীন রাষ্ট্র চোখ রাঙিয়ে কথা বলত, কিন্তু বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার গণমাধ্যমের সমস্যা সমাধানে অংশীদার হিসেবে কাজ করতে চায়।”

 

বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যপ্রবাহের নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সত্য ও মিথ্যা তথ্য একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে, আর মুহূর্তের মধ্যে বিকৃত তথ্য কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। “শুধু অতীতের সমস্যার আলাপে আটকে না থেকে সংকটের এই নতুন চেহারাকে অনুভব করে সমাধানের পথ তৈরি করতে হবে,” বলেন তিনি।

 

গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল অবস্থানে নিয়ে যেতে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তথ্যমন্ত্রী। তার ভাষ্য, “গণমাধ্যম সঠিক ভূমিকা পালন করলে রাষ্ট্র ও ক্ষমতা সবসময় জবাবদিহিতার মুখে থাকবে। ফলে দেশের মানুষ এর সুফল পাবে।” এ লক্ষ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়কে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী ফোরাম গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।

 

সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার স্বাধীনতা দিলেও মালিকপক্ষ যদি সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করে, তাহলে সংকট দূর করা কঠিন হবে। এজন্য রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

জহির উদ্দিন স্বপন জানান, গণমাধ্যম খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনার খসড়া তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে ১৮ জুন মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে এডিটরস কাউন্সিল, অ্যাটকো এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। শিগগিরই বিএফইউজে, ডিইউজে ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

 

ডিজিটাল যুগে নাগরিক সাংবাদিকতার বাস্তবতা উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে আইন বা নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও প্রিন্ট, টেরিস্ট্রিয়াল, ডিজিটাল ও স্যাটেলাইট মিডিয়াসহ সব ধরনের গণমাধ্যমকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনার প্রয়োজন রয়েছে।

 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ডিইউজের সভাপতি শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক নেতারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।