অনলাইন ডেস্ক:
অনলাইনে তথ্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছিল গুগল। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বা এআইয়ের অভাবনীয় প্রসারের ফলে ব্যবহারকারীদের সেই দীর্ঘদিনের অভ্যাসে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। প্রচলিত সার্চ ইঞ্জিনে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘেঁটে তথ্য খোঁজার ঝামেলা এড়াতে অনেকেই এখন সরাসরি উত্তর পেতে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছেন। ওপেনএআইয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটির সার্চধর্মী প্রশ্নের এই বিশাল পরিমাণ বর্তমানে গুগলের মোট অনুসন্ধানের প্রায় ২০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
ভারতের একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চ্যাটজিপিটির ভোক্তা পণ্য বিভাগের প্রধান অ্যাডাম ফ্রাই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। বিগ টেকনোলজি নিউজলেটারের জন্য আলেকজান্ডার কান্ট্রোভিটজকে দেওয়া একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, সার্চ জায়ান্ট গুগলের তুলনায় চ্যাটজিপিটিতে এখন সার্চধর্মী প্রশ্নের পরিমাণ প্রায় এক-পঞ্চমাংশে উন্নীত হয়েছে।
অ্যাডাম ফ্রাই আরও উল্লেখ করেছেন যে, অবিশ্বাস্য গতিতে বাড়ছে এর ব্যবহারকারী। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে চ্যাটজিপিটির সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০০ কোটি থেকে লাফিয়ে ১২০ কোটিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অত্যন্ত অল্প সময়ের এই ব্যবধানে প্ল্যাটফর্মটিতে নতুন ব্যবহারকারী যোগ হয়েছে প্রায় ২০ কোটি।
তথ্য অনুসন্ধানের নতুন এবং জনপ্রিয় ঠিকানা হয়ে ওঠার পেছনে কাজ করছে ব্যবহারকারীদের মানসিকতা ও অভ্যাসের আমূল পরিবর্তন। সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে কোনো বিশেষ বিষয় লিখে অনুসন্ধান করলে বেশ কিছু ওয়েবসাইটের লিংক চলে আসে। এরপর ব্যবহারকারীকে নিজ দায়িত্বে সেই ওয়েবসাইটগুলো ঘুরে প্রয়োজনীয় তথ্য বের করতে হয়। এর বিপরীতে চ্যাটজিপিটি নিজেই বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য একত্র করে একদম সরাসরি উত্তর হাজির করার চেষ্টা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক জরিপেও এআই চ্যাটবটের মাধ্যমে তথ্য অনুসন্ধানের এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের প্রায় ৪২ শতাংশ জানিয়েছেন যে, তাঁরা যেকোনো তথ্য খুঁজে পেতে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া কর্মরত পেশাজীবীদের প্রায় ৩৮ শতাংশ তাঁদের নিয়মিত কাজের প্রয়োজনে এআই ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন।
ওই জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৪৪ শতাংশই চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে থাকেন। অন্যদিকে গুগলের নিজস্ব এআই চ্যাটবট জেমিনি ব্যবহারের হার তুলনামূলক কম, যা মাত্র ২৪ শতাংশ।
অ্যাডাম ফ্রাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ এখন নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, সুনির্দিষ্ট স্থান কিংবা বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে একদম হালনাগাদ তথ্য জানতে সরাসরি চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করছেন। এমনকি অর্থনীতির মতো জটিল বিষয় কিংবা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নানা বিষয়েও এআই চ্যাটবটের ওপর মানুষের নির্ভরতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে একদম সাম্প্রতিক তথ্য জানাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তার বিভিন্ন দুর্বলতা বা ঝুঁকি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে ওপেনএআইয়ের নিজস্ব কর্মীরা সতর্কবার্তা দিয়ে এলেও জনপ্রিয়তার জোয়ার থামছে না।
তবে এত সব পরিসংখ্যান ও এআইয়ের জয়জয়কার দেখার পরও এর অর্থ এই নয় যে সার্চ ইঞ্জিনের বাজারে গুগলের সুদৃঢ় অবস্থান এক মুহূর্তের জন্য হলেও হুমকির মুখে পড়েছে। গুগলের মূল মাতৃপ্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের সার্চ ইঞ্জিনে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ কোটি বা পাঁচ ট্রিলিয়ন অনুসন্ধান পরিচালিত হয়ে থাকে।
অ্যালফাবেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই এর আগেও মন্তব্য করেছিলেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের রমরমা প্রসার মানেই গুগলের সার্চ ব্যবসার নিশ্চিত কোনো ক্ষতি হওয়া নয়। তাঁর মতে, পরিস্থিতি এমন কোনো শূন্যতার হিসাব নয় যে একটি সেবার ব্যবহার বাড়লে অন্যটির ব্যবহার কমতেই হবে। এর পক্ষে উদাহরণ হিসেবে তিনি টিকটকের তুমুল জনপ্রিয়তার পরও ইউটিউবের প্রবৃদ্ধি নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
আইফোন থেকে অ্যানড্রয়েডে খুব সহজে তথ্য স্থানান্তর করবেন যেভাবে, সেই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রযুক্তিপ্রেমীদের মাঝে রয়েছে নানা কৌতূহল।
এদিকে গুগল সার্চের নির্দিষ্ট কিছু ফলাফল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশের মধ্যে সুপ্ত অসন্তোষ কাজ করছে। বিশেষ করে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন বা এসইওনির্ভর অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় ওয়েবসাইটের ভিড় জমে যাওয়ায় সেখান থেকে একদম নির্ভরযোগ্য ও কাজের তথ্য খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের ভোগান্তি এড়াতেই অনেক ব্যবহারকারী এখন গুগলে কোনো কিছু খোঁজার সময় এর সাথে সুনির্দিষ্ট আলোচনার জন্য ‘রেডিট’ শব্দটি যুক্ত করে দেন।
অন্যদিকে, চ্যাটজিপিটি সরাসরি উত্তর দেওয়ার দারুণ সুবিধা দিলেও এর সরবরাহ করা প্রতিটি তথ্যই যে শতভাগ নির্ভুল হবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। মাঝেমধ্যেই ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর উত্তর প্রদান করার এক ধরনের ঝুঁকি থেকেই যায়। তা সত্ত্বেও খুব দ্রুত কাঙ্ক্ষিত তথ্য পাওয়ার দুর্দান্ত সুবিধা সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে এআই চ্যাটবটকে দিন দিন আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলছে।
তবে চ্যাটজিপিটির সার্চধর্মী প্রশ্নের এই বিশাল পরিমাণ গুগলের মোট অনুসন্ধানের ২০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছানোর মানে এই নয় যে গুগল থেকে ঠিক সমপরিমাণ ব্যবহারকারী পাকাপাকিভাবে চ্যাটজিপিটিতে চলে গেছেন। মূলত এই পরিসংখ্যানটি কেবল দুটি ভিন্ন প্ল্যাটফর্মের অনুসন্ধানের পরিমাণের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে। তা সত্ত্বেও নিত্যদিনের তথ্য খোঁজার অভ্যাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের এই ক্রমবর্ধমান ও গভীর প্রভাব যে অনস্বীকার্য, তা আজ বলাই বাহুল্য।











