চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে সড়ক-রেলপথ অবরোধ, ৫ ঘণ্টা পর প্রত্যাহার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে লরির চাপায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) শিক্ষার্থী মাইশা মুসফিরাত নিহত হওয়ার ঘটনায় মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া অবরোধে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। আটকা পড়ে হাজার হাজার যানবাহন। বিভিন্ন স্টেশনে দাঁড়িয়ে পড়ে কয়েকটি ট্রেন। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের আশ্বাসে পাঁচ ঘণ্টা পর অবরোধ প্রত্যাহার করেন শিক্ষার্থীরা।

এর আগে সকাল সোয়া ৯টার দিকে উপজেলার সোনাইছড়িতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত মাইশা (২১) বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তিনি মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটতলিয়া গ্রামের শাখাওয়াত হোসেন ও সালমা আক্তারের মেয়ে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো দুই শিক্ষার্থী।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সকালে মাইশা ও তার কয়েকজন সহপাঠী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় একটি লোকাল বাস সেখানে থামে। এর পেছনে থাকা একটি লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটির ওপর পড়ে। এতে সড়কের পাশে থাকা তিন শিক্ষার্থী বাসের নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন ও হাইওয়ে পুলিশের সহযোগিতায় তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

যে সড়কে প্রাণ গেল সেখানেই জানাজা আইআইইউসি শিক্ষার্থীর

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মহাসড়ক ও রেললাইনে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করেন। তারা ছয় দফা দাবি জানান। দাবিগুলো বাস্তবায়নের আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এতে মহাসড়কে মিরসরাই থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায় যানজট ছড়িয়ে পড়ে।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বিকেল ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া, পুলিশ সুপার মাসুদ আলমসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মামলা করা ও মামলার অগ্রগতি জানানো, দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করে শাস্তি নিশ্চিত করা, পাশের কনটেইনার ডিপোর লরি দিয়ে মহাসড়ক দখল বন্ধ করা, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা, ঘটনাস্থলে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ এবং নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া।

একপর্যায়ে মহাসড়কের ওপর মাইশার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলে তারা অবরোধ প্রত্যাহার করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রশাসন তাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ায় তারা সড়ক থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। নির্ধারিত সময়ে দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হলে তারা আবার আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।

মাইশার বাবা শাখাওয়াত হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আগামী শুক্রবার মেয়ের জন্মদিন পালনের প্রস্তুতি চলছিল। এ উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াতও করা হয়েছিল। মেয়ে খুব খুশি ছিল। তিনি বলেন, ‘আজ মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। কিন্তু তার আর বাড়ি ফেরা হলো না। হাসপাতালে গিয়ে দেখি, মেয়ে লাশ হয়ে গেছে।’

মাইশার মা সালমা আক্তারও মেয়ের মৃত্যুর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন বলে জানান স্বজনেরা।

এ বিষয়ে বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. শফিউল আলম বলেন, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় আহতদের চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে মাইশার মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় জড়িত গাড়ি দুটি আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপে অবরোধ প্রত্যাহার হলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।