জ্বালানি খাতে আমূল পরিবর্তনের পথে ভারত, মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ ৬ লাখ ৮০ হাজার কোটি রুপি

অনলাইন ডেস্ক:

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে বিশাল অংকের বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত, যা দেশটির জ্বালানি খাতের চেহারা সম্পূর্ণ পাল্টে দেবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তেল পরিশোধন, পেট্রোকেমিক্যাল ও গ্রিন হাইড্রোজেন খাতে একের পর এক মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে দেশটি, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের এসব উদ্যোগে সম্ভাব্য মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার কোটি রুপি।

প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে ভারতের সামগ্রিক জ্বালানি উৎপাদন ও পরিশোধন সক্ষমতায় এক সুদূরপ্রসারী ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জোরালো আশা প্রকাশ করেছেন।

ভারতের এই ক্রমবর্ধমান জ্বালানি অগ্রযাত্রায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে, যা দেশটির সবুজ শক্তির লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করছে।

চলতি ২০২৫ সালে দেশটিতে রেকর্ড ৪৪ দশমিক ৫ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা নতুন করে যুক্ত হয়েছে, যার ফলে মোট সক্ষমতা বেড়ে ২৫৪ গিগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে এবং এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশের বেশি।

আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানিবহির্ভূত বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উৎস থেকে প্রায় ৫০০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এগিয়ে চলেছে ভারত।

বাজার বিশ্লেষক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি খাতের সবচেয়ে বড় প্রকল্প হিসেবে অন্ধ্রপ্রদেশের রামায়াপত্তনমে ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসিএল) গ্রিনফিল্ড রিফাইনারি ও পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।

বিশাল এই প্রকল্পে প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ করা হচ্ছে এবং প্রায় ৬ হাজার একর জমির ওপর নির্মিতব্য এই রিফাইনারিতে প্রতিবছর ১২ মিলিয়ন টন তেল পরিশোধনের বিশাল সক্ষমতা থাকবে।

পাশাপাশি এই মেগা প্রকল্পে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন উৎপাদন সক্ষমতার একটি আধুনিক ইথিলিন ক্র্যাকার স্থাপন করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

আগামী ২০২৯-৩০ অর্থবছর কিংবা সালের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি পুরোপুরি চালুর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার নির্মাণকাজে ৩ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে জ্বালানি খাতের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরকারি প্রকল্প হিসেবে রাজস্থানের বারমের জেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে এইচপিসিএল রাজস্থান রিফাইনারি।

সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এই প্রকল্পে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৯ হাজার ৪৫৯ কোটি রুপি।

এই প্রকল্পটিতে বছরে ৯ মিলিয়ন টন তেল পরিশোধন এবং একই সঙ্গে ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের নির্ধারিত সক্ষমতা রাখা হয়েছে।

প্রকল্পটির নির্মাণকাজের সর্বোচ্চ ও তীব্র পর্যায়ে এখানে ৪৩ হাজারেরও বেশি দক্ষ ও সাধারণ শ্রমিক অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করেছেন।

অন্যদিকে ওডিশার পারাদ্বীপে প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থাৎ ৬১ হাজার ৭৭ কোটি রুপি বিশাল ব্যয়ে ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের পক্ষ থেকে একটি সমন্বিত রিফাইনারি ও পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হচ্ছে।

এই জনগুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ প্রকল্প থেকে প্রতিবছর অন্তত ৪০ লাখ টনের বেশি পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ৬৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের এক বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রদেশের বিনায় প্রায় ৪৯ হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে বিপিসিএলের পরিশোধনাগার সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং আসামের নুমালিগড়ে প্রায় ২৮ হাজার ২৬ কোটি রুপির প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিনায় চলমান কাজের মাধ্যমে তেল পরিশোধন সক্ষমতা বছরে ৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ১১ মিলিয়ন টনে উন্নীত করা হবে।

অন্যদিকে আসামের নুমালিগড় প্রকল্পের মাধ্যমে পরিশোধন সক্ষমতা ৩ মিলিয়ন টন থেকে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে ৯ মিলিয়ন টনে উন্নীত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে দেশের বিশাল বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় প্রস্তাবিত প্রকল্প হিসেবে মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরিতে ওয়েস্ট কোস্ট রিফাইনারি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি রুপি, যেখানে বছরে ৬০ মিলিয়ন টন তেল পরিশোধন করার বিশাল সক্ষমতা থাকবে।

তবে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা এবং পরিবেশগত নানা ধরনের কাগজপত্রের জটিলতার কারণে এই প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা পর্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

এসব মেগা উদ্যোগের পাশাপাশি গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিভিন্ন সম্প্রসারণ প্রকল্পে নতুন করে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি রুপি বিশাল বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে এই সমস্ত বহুমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভারতে ১০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি অতিরিক্ত পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।

এর ফলে জ্বালানি ও বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পণ্য আমদানির ওপর দেশের দীর্ঘদিনের পরনির্ভরশীলতা যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, তেমনি নির্মাণ, উৎপাদন ও পরিবহন খাতে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি এবং পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের সুদৃঢ় অবস্থান আরও বেশি শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।