জ্বালানি চাহিদা মেটাতে দেশের কয়লা উত্তোলনে নজর দিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বিদ্যমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সরকার দেশের বিপুল পরিমাণ কয়লা সম্পদ উত্তোলনের দিকে নজর দিচ্ছে। কয়লা বর্তমানে দেশের ৬টি বড় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়। আর প্রতি বছর তাপভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য ২০ মিলিয়ন বা ২ কোটি টনের মতো কয়লা আমদানি করা হয়। অথচ স্থানীয় উৎস থেকেই আমদানি করা কয়লা চাহিদার ৭৫ শতাংশই মেটানো সম্ভব। তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাপ কমবে এবং সাশ্রয় হবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। ফলে দেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিও কমে আসবে। বর্তমানে বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলন করা কয়লার পুরোটাই ওই এলাকায় স্থাপিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার হয়। এখন জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী খনি থেকেও কয়লা উত্তোলনের কথা জানিয়েছে সরকার। ওই খনি থেকে বছরে ১৫ মিলিয়ন বা দেড় কোটি টন কয়লা পাওয়া যাবে। জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের ৫টি কয়লা খনির মধ্যে শুধু বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে কয়লা। বছরে ওই খনি থেকে ৭ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। বর্তমানে ফুলবাড়ী কয়লা খনিও কারিগরিভাবে প্রস্তুত। ওই খনি থেকে কয়লা উত্তোলনে কমপ্রিহেনসিভ ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। তাতে মজুদ থাকা ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার মধ্যে উত্তোলন করা যাবে ৪৭২ মিলিয়ন টন। বছরে ফুলবাড়ী খনি থেকে উত্তোলন করা যাবে ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা। বর্তমানে দেশের ৬টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে ২০ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি হচ্ছে। অথচ ফুলবাড়ী থেকে বছরে ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা পেলে তা দিয়ে দেশের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য আমদানি করা কয়লার ৭৫ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ফুলবাড়ী খনির ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। ওই খনি থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় কয়লা উত্তোলন করতে সময় লাগবে ৫ বছর।

 

সূত্র জানায়, দেশে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক ৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ৭ হাজার ৩১২ মেগাওয়াট। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাদে বাকি ৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিপিডিবিকে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার কয়লা আমদানি করতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১১৯ কোটি ১১ লাখ ডলারের কয়লা আমদানির ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয়। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরলে বাংলাদেশী মুদ্রায় ওই কয়লা আমদানি মূল্য ১৪ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর হিস্যা (আমদানিসহ) ২৮ শতাংশ। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। স্থানীয় কয়লা উত্তোলন করে পূর্ণ সক্ষমতায় ওসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো গেলে আমদানি খরচ কমার সাথে সাথে কমে আসবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর অতিমাত্রার নির্ভরতাও।

 

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে বিপুল ওই সক্ষমতার অর্ধেকও উৎপাদন করা যাচ্ছে না। আবার কয়লা আমদানি করে পূর্ণ সক্ষমতা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানোর অর্থও নেই। অথচ দেশের কয়লা উত্তোলন করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো হলে তা আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী হবে। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনও নিশ্চিত থাকবে। তবে দেশের কয়লা উত্তোলনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষ সমীক্ষা প্রয়োজন। দেশে সবচেয়ে বেশি কয়লা মজুদ রয়েছে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে। ওই খনিতে কয়লার মজুদ পরিমাণ ৫ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন টন। তাছাড়া রংপুরের খালাশপীরে মজুদ রয়েছে ৬৮৫ মিলিয়ন টন, দিনাজপুরের দিঘিপাড়ায় ৭০৬ মিলিয়ন টন এবং বড়পুকুরিয়ায় ৪১০ মিলিয়ন টন। তবে দেশের বিপুল পরিমাণ এই কয়লা সম্পদ উত্তোলন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিগত সরকারগুলো।

 

সূত্র আরো জানায় বিগত ২০০৬ সালে ফুলবাড়ী খনিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু কৃষিজমির ক্ষতি, পরিবেশ বিপর্যয়, বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা, রফতানি ও বিদেশী কোম্পানিকে কাজ দেয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। এক পর্যায়ে ওই আন্দোলন তীব্র হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে তিনজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়। তবে স্থানীয় মানুষের চাহিদা, জীবনমান ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং দেশের বৃহৎ স্বার্থ সঠিক রক্ষা করে এই প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান সরকার খুব শিগগিরই দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করতে যাচ্ছে। চলতি মাসেই পরিকল্পনাটি জাতীয় সংসদে তুলে ধরা হতে পারে। তাতে স্থানীয় কয়লা উত্তোলন নীতির বিষয়টিও থাকবে।

 

এদিকে এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি ও অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন কাজ চলমান রয়েছে। ওই এলাকায় বেশকিছু স্টাডি রয়েছে। স্টাডির ওপর ভিত্তি করে কয়লা উত্তোলনের কার্যক্রম গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ মুহূর্তে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির সেন্ট্রাল পার্টের উত্তর পাশে আরো ৩০০ একর ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কোল মাইনিং ডিজাইনের জন্য শিগগিরই ৬টি বোর হোল খনন শুরু হবে। আর ডিজাইন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

 

অন্যদিকে পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতি প্রকাশ করা হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এক সভায় জানান, এখন আমরা কয়লার উত্তোলনের দিকে যাচ্ছি। ফুলবাড়ী ও অন্যান্য স্থানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনে এগোতে হচ্ছে। কারণ সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মিশ্রণের বিষয়ে মোটামুটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতি দেয়া হবে।