নিজস্ব প্রতিবেদক:
বর্তমান সরকার দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কথা বললেও বাস্তবে দেশজুড়ে বাড়ছে হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা। মূলত রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, পূর্বশত্রুতা, পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা নিয়ে সংঘাত, মাদক ব্যবসা ও অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই বাড়ছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম ৬ মাসে সারা দেশে ১ হাজার ৮০৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর ওসব ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। পুলিশ বিভাগের তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে মাসে গড়ে হত্যা মামলা হয়েছে প্রায় ৩০০টি। তার মধ্যে মার্চ, মে ও জুনে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা। ওসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৬টি ট্রিপল মার্ডার ও ৪টি ডাবল মার্ডার রয়েছে। অথচ গত বছরের প্রথম ৬ মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল ১ হাজার ৫৮৫টি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিগত ৬ মাসে দেশে আইন-শৃঙ্খলা উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ৬ মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি হত্যা মামলা হওয়ার তথ্য মিলেছে। যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির বার্তা বহন করে। দেশে বেশিসংখ্যক হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সন্ত্রাস ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে হত্যাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মব সন্ত্রাস বন্ধ ও স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধে গুরুত্ব দেয়া। বর্তমানে সারা দেশেই নানা ধরনের অপরাধ, বিশেষ করে মারামারি, মব তৈরি করে হামলা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে।
সূত্র জানায়, সারা দেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নথিভুক্ত হয়েছে ২৫০টি হত্যা মামলা। আর মার্চে তা বেড়ে ৩১৭টিতে দাঁড়ায়। তাছাড়া এপ্রিলে ২৮৮টি ও মে মাসে ৩১০টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হলেও জুনে হত্যা মামলা বেড়ে ৩২৬টিতে দাঁড়ায়। আর সর্বশেষ জুলাইয়ে নথিভুক্ত হয় আরো ২৯৮টি হত্যা মামলা। ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৬ মাসে প্রায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। আর ওই সময়ে সারা দেশে ১ হাজার ৮০৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ফলে প্রতি মাসে সংঘটিত হয়েছে গড়ে প্রায় ৩০০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ড। তবে হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে ঘটেছে। তাছাড়া মব সন্ত্রাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নারীদেরও মিলছে রেহাই। এককথায় বিদ্যমান পরিস্থিতি বিশ্বে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে। মব সন্ত্রাস শুধু সমাজ ও রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে না, অশালীন ভাষার ব্যবহার ও অসহিষ্ণু আচরণের মাধ্যমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে দেশের সংস্কৃতিতেও।
সূত্র আরো জানায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৬ মাসে ঢাকায় সর্বোচ্চ ৪৩৫টি হত্যা মামলা এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৯০টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। তার মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীতেই ২৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। ওসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে চাঁদাবাজি, জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, মাদক, আধিপত্য বিস্তার, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, পূর্বশত্রুতা, কিশোর গ্যাং ও রাজনৈতিক বিরোধের মতো কারণ ছিলো।
এদিকে এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, খুনের ঘটনা বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক ও অপরাধমূলক বিরোধের কারণে কমবেশি হয়ে থাকে। প্রতিটি হত্যাকান্ডের নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। খুনসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিগত ছয় মাসে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। আর আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে সন্তুষ্টির বিষয়টি দেশের জনগণই মূল্যায়ন করবে।










