তরুণদের মাঝে বাড়ছে এইডসের আশঙ্কাজনক বিস্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশে প্রতি বছরই অত্যন্ত নীরবে এইচআইভি বা এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, যা দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস বা এইচআইভি মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংসকারী এমন এক নীরব ঘাতক যার চূড়ান্ত পরিণতি হলো এইডস। যদিও এই রোগ নিরাময়ের কোনো স্থায়ী প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি, তবে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির মাধ্যমে শরীরে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি রোধ করে আক্রান্তদের সুস্থ রাখা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এই চিকিৎসার সুফলের সমান্তরালে বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের গ্রাফ যেভাবে জ্যামিতিক হারে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, তা দেশের সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য এক মারাত্মক অশনিসংকেত। জাতীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে ২০২৪ সালে যেখানে ১ হাজার ৪৩৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ১ হাজার ৮৯১ জনে দাঁড়িয়েছে এবং একই বছরে এই মরণব্যাধিতে প্রাণ হারিয়েছেন ২১৯ জন। ১৯৮৯ সালে দেশে প্রথম এইডস রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট অনুমিত সংক্রমিতের সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৮০ জন হলেও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারিতে আনা সম্ভব হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৩ জনকে, যার মধ্যে মাত্র ৭৪ শতাংশ অর্থাৎ ৮ হাজার ৫৭৫ জন নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় আছেন। সংক্রমণের এই নতুন তরঙ্গে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এর দ্রুত বিস্তার। যদিও এখনো মোট আক্রান্তের বড় অংশ অর্থাৎ ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ বিবাহিত, কিন্তু ২০১৯ সালে মোট আক্রান্তের মধ্যে যেখানে অবিবাহিতদের হার ছিল মাত্র ১৯ শতাংশ, তা ২০২৪ সালে ৩১ দশমিক ৫ এবং ২০২৫ সালে এসে ৪২ দশমিক শূন্য চার শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের ৬২ দশমিক শতাংশেরই বয়স ২৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে, যা দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী, আর ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের হার ২১ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ। এই সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনের পেছনে ঝুঁকিপূর্ণ শারীরিক আচরণ এবং বিশেষ কিছু জনগোষ্ঠীর অসচেতনতা বড় ভূমিকা রাখছে। এইডস/এসটিডি কর্মসূচির তথ্যমতে, দেশে পুরুষ সমকামীদের মধ্যে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে যেখানে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ছিল, তা সামপ্রতিক বছরগুলোতে নবিজহীনভাবে বেড়ে প্রায় ৩৪ থেকে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। আক্রান্তদের সামগ্রিক হারের মধ্যে সমকামী পুরুষ ৩৪ শতাংশ, পুরুষ যৌনকর্মী ১৪ শতাংশ, প্রবাসফেরত নাগরিক ১২ শতাংশ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১১ শতাংশ এবং শিরায় সূচের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ৬ শতাংশ। অনেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বিদেশ থেকে আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসা প্রবাসীদের প্রকৃত হার আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে এখনো কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যায়নি। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই দেশে প্রবেশ করছেন এবং তাদের মাধ্যমে অজান্তেই সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে। ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক পর্যায়েও এই সংক্রমণ অত্যন্ত নীরবে কিন্তু মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে, যার বড় উদাহরণ রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগ। রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় এ পর্যন্ত মোট ৭৯৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩১০ জনই সিরাজগঞ্জ জেলার। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে শনাক্ত ১৩৯ জন রোগীর মধ্যে হড়নষব২ জনই সমকামী, যা মোট আক্রান্তের ৬৬ শতাংশেরও বেশি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নগরীর সি অ্যান্ড বি মোড়, কোর্ট স্টেশন কিংবা পদ্মাপাড়ের মতো নির্জন এলাকাগুলোতে রাতে সমকামীদের গোপন অফলাইন জমায়েতের পাশাপাশি ফেসবুক, টেলিগ্রাম বা ডেটিং অ্যাপের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই ঝুঁকিপূর্ণ নেটওয়ার্ক দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। একইভাবে ময়মনসিংহ বিভাগেও গত সাড়ে ছয় বছরে ২৫২ জন এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন আটজন, যেখানে ২০২০ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র একজন। ময়মনসিংহে বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লোকেশনভিত্তিক ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে একে অপরের সংস্পর্শে এসে অনিরাপদ সম্পর্কে জড়াচ্ছেন, যা এই নীরব বিস্তারের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় দেশের চিকিৎসা ও পরীক্ষা পরিকাঠামোর দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বর্তমানে দেশের ৪১টি জেলায় এইচআইভি পরীক্ষার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ নেই, যার কারণে বহু আক্রান্ত মানুষ চিরকাল শনাক্তের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। দেশের একমাত্র বিশেষায়িত ঢাকা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২০২৫ সালে ৩০০ জন রোগী চিকিৎসা নিলেও সেখানে প্রয়োজনীয় উন্নত ল্যাব সাপোর্ট ও কিটের তীব্র সংকট রয়েছে, ফলে রোগীরা যখন একদম মুমূর্ষু অবস্থায় আসেন তখন তাদের যথাযথ সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া লজিস্টিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন; যেমন রাজশাহীতে নতুন এআরটি সেন্টার চালু হলেও পুরোনো রোগীদের ফাইল এখনো বগুড়ার হাসপাতালে আটকে থাকায় অসুস্থ শরীর ও বাড়তি অর্থ খরচ করে তাদের দূরপাল্লায় যাতায়াত করতে হচ্ছে। ময়মনসিংহেও বেশ কিছু মাস সহায়ক ওষুধের সংকট ছিল, যা রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করেছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এইচআইভি মানেই এখন আর নিশ্চিত মৃত্যু নয় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে প্রিপ কিংবা পেপ-এর মতো প্রতিষেধক ব্যবস্থার মাধ্যমে এর ঝুঁকি যথাক্রমে ৯০ ও ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এই চিকিৎসাগত সমাধানের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে এইডসমুক্ত করার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সমকামিতা বা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক এ দেশের প্রচলিত আইন তথা দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা এবং সকল ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হওয়া সত্ত্বেও তরুণদের একটি অংশ এতে ধাবিত হচ্ছে। তাই এই মহামারি রুখতে কেবল হাসপাতাল বা এনজিওর ওপর নির্ভর না করে স্কুল পর্যায়ে সঠিক প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা চালু করা, ধর্মীয় ও নৈতিক অনুশাসন জোরদার করা, পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করে আক্রান্তদের চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।