তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রতি মিনিটে একজন প্রাণ হারাচ্ছে

অনলাইন ডেস্ক:

পৃথিবী ক্রমে উত্তপ্ত হচ্ছে। তবে এতে করে কেবল গ্রহটিই জ্বলছে না। স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৫ প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রতি মিনিটে একজন মানুষ তাপের কারণে মারা যাচ্ছে। দ্য ল্যানসেটে মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি অনুসারে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে এখন প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, যা প্রায় প্রতি মিনিটে একজনের মৃত্যুর সমান। এই সংখ্যাটি ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করে।

৭১টি প্রতিষ্ঠান জুড়ে ১২৮ জন গবেষকের অংশগ্রহণে তৈরি বার্ষিক মূল্যায়নের এই নবম সংস্করণটি একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে এবং খুব দেরি হওয়ার আগেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক জলবায়ু পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তাগিদ দিয়েছে। প্রতিবেদনটির মতে, প্রতিবছর আনুমানিক পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার মানুষ তাপের কারণে মারা যায়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যাটি ক্রমাগত বাড়ছে। গবেষকরা দেখেছেন, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মানুষ যে তাপপ্রবাহের দিনগুলো অনুভব করেছে, তার ৮৪ শতাংশই মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া ঘটত না।

শিশু ও বয়স্করাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এক বছরের কম বয়সী শিশুরা এখন ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি তাপপ্রবাহের দিনের সম্মুখীন হয়, অন্যদিকে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্করা তিন গুণ বেশি তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হন। তাপ ছাড়াও এই গবেষণা দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন মানুষের জীবন নির্ভরশীল ব্যবস্থাগুলোকে অস্থির করে তুলছে—তা খাদ্য ও পানি থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা পর্যন্ত বিস্তৃত।

২০২৪ সালে পৃথিবীর স্থলভাগের ৬১ শতাংশ চরম খরায় আক্রান্ত হয়েছিল, যা ১৯৫০-এর দশকের গড়ের তিন গুণ। ২০২৪ সালে দাবানলের ধোঁয়ায় এক লাখ ৫৪ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড। মশাবান্ধব উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে ১৯৫০-এর দশক থেকে ডেঙ্গু সংক্রমণের সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। তাপের সংস্পর্শের কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতার ক্ষতি ২০২৪ সালে এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ। তাপের কারণে রাতে ঘুমের ক্ষতি ৯ শতাংশ বেড়েছে, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।

গবেষণাটিতে সতর্ক করা হয়েছে, বিশ্বের কিছু অংশ শারীরবৃত্তীয় টিপিং পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। এটি তাপ ও আর্দ্রতার এমন একটি সীমা, যেখানে মানবদেহ নিজেকে কার্যকরভাবে শীতল করতে পারে না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, সামান্য সময়ের জন্য তাপের সংস্পর্শও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়া বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, মানবতা এখন কয়েকটি রাস্তার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে। একটি পথ ক্রমবর্ধমান মৃত্যু, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং পরিবেশগত পতনের দিকে নিয়ে যায়। অন্যটি পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং অভিযোজন দ্বারা চালিত একটি বাসযোগ্য, স্বাস্থ্যকর বিশ্বের দিকে নিয়ে যায়। জলবায়ু প্রবক্তা এবং গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে যেমন দাবি করে আসছেন, এখন আর আংশিক পদক্ষেপ নেওয়ার সময় নেই, বরং একটি উত্তপ্ত গ্রহকে শীতল করার জন্য সুস্পষ্ট এবং বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সূত্র : বিজনেস স্টান্ডার্ড