অনলাইন ডেস্ক:
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ থেকে প্রায় ৭০০ আন্দোলনকারীকে আটক করেছে পুলিশ। শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও যুব সংগঠনের ডাকা এ কর্মসূচিতে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে অনিয়ম এবং বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করা হয়। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় ১২ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আম আদমি পার্টির (আপ) দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতিশি, দিল্লি আপের সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ, বিধায়ক সঞ্জীব ঝা এবং রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় সিং রয়েছেন। এ ছাড়া এআইএসএ, এসএফআই, এনএসইউআই, ডিওয়াইএফআইসহ বিভিন্ন ছাত্র ও যুব সংগঠনের কর্মীরাও আটক হয়েছেন।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এয়ারটেল, রিলায়েন্স জিও ও ভোডাফোন আইডিয়াকে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত যন্তর মন্তর এবং এর ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দেশের কপি সংবাদমাধ্যমটি দেখেনি।
বিক্ষোভের আয়োজনে ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, এআইএসএ, এসএফআই, এনএসইউআই, ডিওয়াইএফআই এবং অন্যান্য ছাত্র ও যুব সংগঠন। পুলিশ জানিয়েছে, কর্মসূচির জন্য অনুমতি দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তাজনিত কারণ এবং সম্ভাব্য বড় জনসমাগমের আশঙ্কায় যন্তর মন্তর এলাকায় সমাবেশ ঠেকাতে আগেই নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতিশি, সৌরভ ভরদ্বাজ ও সঞ্জীব ঝা যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর পর আটক হন। সঞ্জয় সিং বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার সময় নর্থ এভিনিউতে বাধা পান। পরে তিনি সংসদ চত্বরে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির কাছে অবস্থান নিয়ে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তোলেন।
সৌরভ ভরদ্বাজ এক ভিডিও বার্তায় বলেন, পুলিশ তাদের জানিয়েছে যে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। যন্তর মন্তর নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল হওয়ার পরও সেখানে কর্মসূচির জন্য আলাদা অনুমতির প্রয়োজন কেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, আপের পক্ষ থেকে প্রায় এক সপ্তাহ আগেই কর্মসূচির অনুমতি চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।
ভরদ্বাজ বলেন, “আমরা আমাদের উদ্বেগ প্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করছি।”
সঞ্জয় সিংকে বিক্ষোভস্থলে যেতে বাধা দেওয়ার পর তিনি সংসদ চত্বরে অবস্থান নেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার এবং কয়েকজন বিরোধী নেতার বাড়ির বাইরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে বিজেপি নেতৃত্বের নির্দেশে কাজ করার অভিযোগও তোলেন। এসব ছিল তাঁর অভিযোগ।
ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মীদের বিরুদ্ধেও পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ঐশী ঘোষ জানান, এসএফআই ও ডিওয়াইএফআইয়ের বেশ কয়েকজন কর্মীকে আটক করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, রাজধানীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে যেভাবে দেখা যায় না, জ্ঞানেশ কুমারের নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের সেভাবে মাঠে নামতে দেখা যাচ্ছে। আন্দোলনকারীদের আটক করেও কর্মসূচি থামানো যাবে না বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে প্রায় ৭০০ এসএফআই সদস্য যন্তর মন্তরে যাওয়ার চেষ্টা করলে অশোকা রোড গোলচত্বরে তাদের বাধা দেয় পুলিশ। এ সময় অনেককে আটক করা হয়। এনএসইউআইয়ের জাতীয় সভাপতি বিনোদ ঝাখরসহ সংগঠনটির কয়েকজন কর্মীকেও যন্তর মন্তরের দিকে পদযাত্রার সময় আটক করা হয়। বিনোদ ঝাখর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, তাঁদের কয়েকজন কর্মীকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেসও রাইসিনা রোডে নিজেদের কার্যালয় থেকে যন্তর মন্তরের দিকে পদযাত্রা করে। সংগঠনটির সভাপতি উদয় ভানু চিবের নেতৃত্বে হওয়া ওই কর্মসূচিতে বিক্ষোভকারীদের হাতে জ্ঞানেশ কুমার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখের ছবি লাগানো মাস্ক এবং বিভিন্ন পোস্টার ও ব্যানার দেখা যায়। সংগঠনটি নির্বাচন কমিশনের কাছে ভোটের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি তোলে।
বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। ফিরোজ শাহ রোডে কয়েকজনকে ব্যারিকেড টপকে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতেও দেখা যায়। এআইএসএর কর্মীরা পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ এবং নারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ করেন। তবে লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
বিক্ষোভ ঠেকাতে যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও ব্যারিকেড মোতায়েন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যদেরও রাখা হয়। কয়েকটি এলাকায় মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিতে পারেন বলে তারা ধারণা করেছিল।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় দিল্লির কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এর মধ্যে রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট ও যন্তর মন্তর স্টেশন ছিল। আন্দোলনকারীদের যন্তর মন্তরে যেতে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ রাখা হয়।
এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং এর জন্য নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি প্রয়োজন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান হলো, ভোটার তালিকা সংশোধন নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসারেই করা হচ্ছে।
জুলাইয়েও যন্তর মন্তরে ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছিল
যন্তর মন্তরে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা এ বছর এই দ্বিতীয়বারের মতো ঘটল। জুলাইয়ে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বিক্ষোভের সময়ও কেন্দ্রীয় দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকার মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা একাধিকবার বন্ধ করা হয়েছিল। ওই সময় ককরোচ জনতা পার্টি তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আন্দোলন করেছিল।
হিন্দুস্তান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে সাতটি স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর এবং ককরোচ জনতা পার্টি আন্দোলন প্রত্যাহার করলে ইন্টারনেট পরিষেবাও পুনরায় চালু হয়। এ সময়ের ইন্টারনেট বন্ধের কয়েকটি আদেশের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।
জুলাইয়ের ওই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেটবিহীন যোগাযোগের জন্য কিছু বিক্ষোভকারী ব্লুটুথভিত্তিক ‘বিচ্যাট’ অ্যাপ ব্যবহারের চেষ্টা করেছিলেন বলেও হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান বিক্ষোভও এসআইআর নিয়ে বিরোধী দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ। শুক্রবারের কর্মসূচিতে পুলিশি বাধা, গণআটক, মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিতের মধ্যেই যন্তর মন্তর এলাকায় দিনভর উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়।











