দিল্লির মঞ্চ থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে মমতার হুংকার, পদত্যাগের দাবি

অনলাইন ডেস্ক:

ভোট চুরি করে দেশের গণতন্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে—রোববার দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার মহাসমাবেশ থেকে এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে তীব্র কটাক্ষ করে অবিলম্বে তার পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের এই শীর্ষ নেত্রী।

রোববার ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে এই বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন, নির্বাচনী অনিয়ম এবং নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ জানাতে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টিসহ দেশের বিভিন্ন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা এই কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।

সমাবেশে মাইক্রোফোন হাতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা হারিনি, আমাদের হারানো হয়েছে। ভোট লুট করেছে বিজেপি, দেশের গণতন্ত্রকে হরণ করেছে।’ তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের চোখের পলকে লক্ষ লক্ষ ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তার জোরালো দাবি, ইতোমধ্যে রাজ্যজুড়ে এক কোটিরও বেশি মানুষের নাম সুকৌশলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরাসরি আক্রমণ করে মমতা বলেন, কেবল ভোট জালিয়াতিই নয়, ভোট গণনার পুরো প্রক্রিয়াটাকেও কার্যত অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে উদ্দেশ করে অবমাননাকর ও ব্যাঙ্গাত্মক ‘ভ্যানিশ কুমার’ নাম ব্যবহার করে তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি দল যৌথভাবে দেশের প্রাচীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে তিলে তিলে দুর্বল করে দিচ্ছে।

ভোটার তালিকার এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াকে তীব্র কটাক্ষ করে মমতা বলেন, এই পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক অভিসন্ধি, যার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো বিজেপিকে অন্যায় রাজনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়া। তার অভিযোগ, এই হঠকারী প্রক্রিয়ায় শুধু সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না, এর জেরে বাংলার সাধারণ মানুষের চাকরি, সামাজিক সম্মান এবং মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সমাবেশে উপস্থিত বিরোধী জোটের অন্য নেতাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তেজস্বী যাদব, কপিল সিব্বল, অভিষেক মনু সিংভি, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া সুলেসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিশিষ্ট প্রতিনিধিরা দেশের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে গণতন্ত্র রক্ষার ঐতিহাসিক লড়াইয়ে আজ এক মঞ্চে সমবেত হয়েছেন। দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে মমতা আহ্বান জানিয়ে বলেন, মাতৃভূমির ভবিষ্যৎ রক্ষার এই গুরুদায়িত্ব এবার এ দেশের যুবসমাজকেই নিজ কাঁধে তুলে নিতে হবে। প্রয়োজনে একজন অভিভাবক হিসেবে তিনি নিজে তরুণদের সঠিক পথ দেখিয়ে যাবেন।

বর্তমান প্রজন্মের জেন-জি তরুণদের সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিবাদ ও চলমান আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি দলীয় গণ্ডির ঊর্ধ্বে ওঠে সবাইকে এই জোরালো লড়াইয়ে একসঙ্গে শামিল হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান। কেন্দ্রীয় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং পুলিশ প্রশাসনের একটি অংশকে রাজনৈতিক স্বার্থে বেআইনিভাবে ব্যবহারের তীব্র সমালোচনাও করেন তিনি। তার স্পষ্ট উচ্চারণ, দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে বিজেপির বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে এবং তাদের ক্ষমতার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি ভারতের বিখ্যাত বিপ্লবী রামপ্রসাদ বিসমিলের অমর বিপ্লবী কবিতার পঙ্‌ক্তি আবৃত্তি করে যেকোনো মূল্যে এই আন্দোলন ও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

দেশের বিচার বিভাগের কাছেও অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও সাহসী ভূমিকা পালনের বিশেষ আবেদন জানান তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য হলো, দেশের অবশিষ্ট গণতন্ত্র এবং সাধারণ মানুষের পবিত্র ভোটাধিকার যেকোনো মূল্যে রক্ষার্থে দেশের উচ্চ আদালত ও বিচারব্যবস্থাকে আরও অনেক বেশি সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

উল্লেখ্য, ভোটার তালিকার সাম্প্রতিক এই সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আনীত যাবতীয় অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল ও একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ভোটার তালিকা থেকে ভুয়া, মৃত এবং একই ব্যক্তির একাধিক জায়গায় নিবন্ধিত ভোটারের নাম পাকাপাকিভাবে বাদ দেওয়া। তাছাড়া, যদি কোনো প্রকৃত ভোটারের নাম ভুলবশত এই তালিকা থেকে বাদ পড়ে গিয়ে থাকে, তবে তাদের জন্য পুনরায় নাম নিবন্ধনের পর্যাপ্ত ও উন্মুক্ত সুযোগও রয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।