দেশজুড়ে মহামারীর রূপ নিচ্ছে হাম

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশজুড়ে মহামারীর রূপ নিচ্ছে হাম। ইতিমধ্যে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সহস্রাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের নানামুখী উদ্যোগেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বরং তা নজিরবিহীনভাবে বেড়েই চলেছে। ইতিপূর্বে হাম উপসর্গে ও হামে আক্রান্ত হয়ে এদেশে এতো মৃত্যু আগে কখনো ঘটেনি। মূলত দায়িত্বশীলদের অবহেলা ও গাফিলতিই দেশে হামের এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী। যদিও সব বয়সী মানুষেরই হাম হতে পারে। কিন্তু এতে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়। আর হামের টিকা নিলেও শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে অন্তত এক মাস সময় লাগে। কিন্তু টিকা পাওয়া শিশুদের শরীরে ইতিমধ্যে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও অনেক শিশুর অপুষ্টি বা বিভিন্ন রোগের কারণে গড়ে উঠছে না প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। ফলে সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সহস্রাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আর দিন দিন বেড়েই চলেছে হামে আক্রান্তের সংখ্যা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, প্রতিদিন দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ মিলছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দেয়ার তথ্য মিলেছে । আর ওই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার মধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে।

 

সূত্র জানায়, হাম প্রতিরোধে ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী অন্তত ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকা দেয়া জরুরি। বর্তমানে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তা ১৫ বছর পর্যন্ত এক্সটেন্ড করলে সবার মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সবার গড়ে উঠবে। বর্তমানে অপুষ্টিতে থাকার কারণে অনেক শিশুর প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে না। আর ওসব শিশুরা সহজেই হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে। অবশ্য টিকা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু বন্ধ হয়ে যাবে এমন নাও হতে পারে। কারণ টিকা দেয়ার এক মাস পরে হামের সংক্রমণ কমে আসবে। আর শুধু টিকা না। টিকা তো হলো গিয়ে প্রাথমিক শর্ত। মৃত্যু কমাতে হলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি। রোগীকে কমিউনিটি থেকেই শনাক্ত করে চিকিৎসা ব্যবস্থার অধীনে আনা প্রয়োজন।

 

সূত্র আরো জানায়, দেশের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ কম। সেজন্যই রোগীদের প্রাইমারি লেভেল প্রাইমারি হেলথ কেয়ারে মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট দিতে হবে। তাহলেই কমে আসবে ক্রিটিক্যাল রোগীর সংখ্যা। শুধু আইসিইউ দিয়ে মৃত্যু কমানো যাবে না। কারণ শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসলে কয়জনকে বাঁচানো সম্ভব। সেজন্য জ্বর হওয়ার প্রথম থেকেই যেন মেডিক্যাল কেয়ারে থাকে, প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের তা নিশ্চিত করতে হবে। আর সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ারে রোগীকে হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে বড় হাসপাতালের দরকার নেই। তাহলে বড় হাসপাতালে কমে আসবে রোগীর চাপ।

 

এদিকে হামের সংক্রমণ মোকাবিলায় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে আবারো হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে দেশে এসে পৌঁছেছে। অবশিষ্ট টিকাও আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে পৌঁছাবে।

 

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হামে শিশু মৃত্যুর বিষয়ে বিগত সরকারকে দায়ি করে জানান, বিগত সরকার দেশে কোনো টিকা রেখে যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার মাত্র ২১ দিনের মধ্যে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুর জন্য টিকা সংগ্রহ করে টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। বর্তমানে হামের রোগীর জন্য প্রতিটি হাসপাতালে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েই রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে সোসাইটি অব মেডিসিনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।