দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উন্মুক্ত করা হয়েছে সমুদ্রের ২৬টি ব্লক

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উন্মুক্ত করা হয়েছে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লক। ইতিমধ্যে ওসব ব্লকে অনুসন্ধানে ডাকা হয়েছে আন্তর্জাতিক দরপত্র। আর তাতে সাড়া দিয়ে ইতিমধ্যে তথ্য প্যাকেজ কিনেছে ৭টি বিদেশী কোম্পানি। তাছাড়া এ ব্যাপারে পেট্রোবাংলার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে আরো কয়েকটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি। বর্তমানে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) সংশোধন করে বাড়ানো হয়েছে আগের তুলনায় আর্থিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা। যাতে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কোম্পানি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী হয়। পেট্রোবাংলা গত ২৪ মে অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬-এর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। আর আগামী ৩০ নভেম্বর দরপত্র জমা দেয়ার শেষ সময়। জ্বালানি বিভাগ এবং পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দ্রুত দেশে গ্যাসের মজুদ কমে আসায় বঙ্গোপসাগরে নতুন গ্যাসের সন্ধানকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ২৯.৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ। ইতিমধ্যে ২২.১১ টিসিএফ উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট রয়েছে ৭.৬৩ টিসিএফ। তাছাড়া বর্তমানে এলএনজি আমদানির ব্যয়ও বাড়ছে। গত ৮ অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানিতে সরকারকে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অফশোর বিডিং রাউন্ডে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পরিবর্তন আনা হয়েছে গ্যাসের দাম নির্ধারণের কাঠামোতেও। পিএসসি-২০২৬ অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের ১১ শতাংশ এবং অগভীর সমুদ্রে সাড়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তার আগে ২০২৩ সালের পিএসসিতে উভয় ক্ষেত্রেই ওই হার ছিল ১০ শতাংশ। পাশাপাশি সমুদ্র থেকে গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্মাণের দায়িত্বও ঠিকাদারি কোম্পানিকে দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাইপলাইনের গ্যাসের মজুদ, সরবরাহ ও খরচ বিবেচনায় ঠিকাদারি কোম্পানিকে ট্যারিফ দেয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তাছাড়া রাখা হয়েছে কর ও শুল্ক অব্যাহতি, পেট্রোবাংলার মাধ্যমে ঠিকাদারের আয়কর পরিশোধ এবং নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির সুযোগও।

 

সূত্র জানায়, সরকার বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। ওই লক্ষ্যে বিশ্বের ১০৬টি আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির কাছে দরপত্রে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোর মাধ্যমে বিদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছে বিডিং রাউন্ডের প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতের তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এসপি গ্লোবালের প্ল্যাটফর্মেও প্রকাশ করা হয়েছে দরপত্রের নোটিশ। আশা করা হচ্ছে এবার বিদেশী কোম্পানিগুলো আগ্রহী হবে। কারণ বিগত ২০২৪ সালে মাত্র ৭টি বিদেশি কোম্পানি দরপত্র দলিল কিনলেও শেষ পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয়নি কোনো কোম্পানিই। ওই সময় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো যেসব পর্যবেক্ষণ, পরামর্শ ও উদ্বেগ লিখিতভাবে জানিয়েছিল, এবার সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে সংশোধন করা হয়েছে নতুন পিএসসি প্রণয়ন এবং দরপত্রের বিভিন্ন শর্ত। ফলে এখন পর্যন্ত যোগাযোগ হওয়া আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া যায়নি কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। বরং বেশ কয়েকটি কম্পানি বাংলাদেশের অফশোর এলাকায় অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আর দরপত্র জমা দেয়ার জন্য এখনো কয়েক মাস সময় থাকায় ওই সময়ে আরো কোম্পানি তাতে যুক্ত হওয়ার আশা রয়েছে।

 

সূত্র আরো জানায়, বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান দেশের জন্য জরুরি। কারণ স্থলভাগে ১০০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হলেও ওসব কূপে মিলছে না আশানুরূপ গ্যাসের সন্ধান। এবার বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে পিএসসিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনায় বিশ্বের বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ইতিমধ্যে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সাতটি প্রতিষ্ঠান কিনেছে ইনফরমেশন প্যাকেজ। তার মধ্যে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও দরপত্রের নথি কিনেছে। ইনফরমেশন প্যাকেজ ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বেরিংগিয়া এনার্জি গ্লোবালের স্থানীয় এজেন্ট বিরিংগিয়া পাওয়ার বাংলাদেশ, ক্রিসএনার্জি, পিইএএল এনার্জি অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, ওনোদা ইনকরপোরেটেড, রিস্ট্যাড এনার্জি, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এবং টিপিএও। আর দরপত্রের নথি কিনেছে শুধু টিপিএও। ইনফরমেশন প্যাকেজ কেনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো সমুদ্রের ব্লকগুলোর ভূতাত্ত্বিক ও কারিগরি তথ্য পর্যালোচনার সুযোগ পাচ্ছে। আর ওসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্রে অংশ নেয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

 

এদিকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিজয়ের এক যুগের বেশি সময় পরও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সাফল্য পায়নি। অথচ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ও গ্যাস আবিষ্কারে এগিয়ে গেছে। এমন বাস্তবতায় নতুন পিএসসির মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ তৈরি এবং ২৬টি ব্লকে অনুসন্ধান শুরু করা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশে বিগত ২০১৮ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। যদিও তা ছিলো দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণের একটি পরিপূরক ব্যবস্থা। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তা এখন জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে। উৎপাদন কমতে থাকায় প্রতিবছর বাড়ছে এলএনজি আমদানির পরিমাণ, সেই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও। এমন পরিস্থিতিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ছাড়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বিকল্প নেই।

 

অন্যদিকে এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি এবং অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, ইতিমধ্যে ৭টি বহুজাতিক কম্পানি পেট্রোবাংলার কাছ থেকে তথ্য প্যাকেজ কিনেছে। আর একটি কোম্পানি দরপত্রের ডকুমেন্টও কিনেছে। আরো কয়েকটি আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। আশা করা যায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আরো কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেবে।

 

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ অফশোর বিডিং রাউন্ড ঘোষণার আনুষ্ঠানিক আয়োজনে জানান, সমুদ্র থেকে ভবিষ্যতে তেল বা গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হলে তা দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে। এরই মধ্যে অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সরকারের প্রত্যাশা এবারের অফশোর বিডিং রাউন্ড অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক হবে।