দেশে প্রচুর অবৈধ অস্ত্রে নাজুক হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশে ঢুকেছে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র। ফলে সহজেই এখন মিলছে অবৈধ অস্ত্র। প্রায় প্রতিদিনই অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সীমান্তপথে ওসব অস্ত্র কাটআউট পদ্ধতিতে দেশ ঢুকছে। বিক্রি ও সন্ত্রাসীদের কাছে ওসব অস্ত্র ভাড়া দেয়া হয়। আর দেশে চাঁদা ও মাদকের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার কাজে ওসব অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে ভালো কন্ডিশনের একটি ৭.৬৫ এমএম অস্ত্রের দাম আড়াই লাখ টাকা বলে জানা যায়। তাছাড়া অপরাধ জগতে নতুন সংযোজন হয়েছে পেনগান। যা কলমের মতো দেখতে ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্র। একটি গুলির ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ অত্যাধুনিক ওই ক্ষুদ্রাস্ত্রের সন্ধান পায়। দেশে পেনগানের ব্যবহার শনাক্ত হওয়ায় গোয়েন্দারা তার উৎস ও কারবারি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। তাছাড়া অতিসম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁও থেকে ৭.৬৫ এমএম মডেলের বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিনসহ তিন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে আধিপত্য বিস্তারে দেশে এখন প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেকটাই অসহায়। কারণ অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। ফলে দেশের অপরাধ জগৎ আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠার শঙ্কা বাড়ছে। তাছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় লুট হওয়া ১ হাজার ৩২৩টি অস্ত্র ও আড়াই লাখের বেশি গুলি এখনো নিরাপত্তার হুমকি হয়েই রয়েছে। সেগুলো দাগি আসামি ও উগ্রবাদীদের হাতে রয়েছে পুলিশ আশঙ্কা করছে। মূলত কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া অবৈধ অস্ত্রের স্রোত। বরং দিন দিন বাড়ছে তার গতি।

 

সূত্র জানায়, অবৈধ অস্ত্রের দাম সমপ্রতি বেড়েছে ৩-৪ গুণ। আগে যে অস্ত্র ৩০-৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা এক-দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মূলত চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। এখন চাহিদা অনুযায়ী সহজেই অত্যাধুনিক অস্ত্র অর্ডার করা যাচ্ছে। আর ওসব অবৈধ অস্ত্র বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বেশি অর্ডার দিচ্ছে। কিন্তু দেশে অবৈধ অস্ত্রের কোনো হালনাগাদ তালিকা না থাকায় অস্ত্রের কারবার ঠেকাতে মাঠপুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সারা দেশে কমপক্ষে শতাধিক অস্ত্র ব্যবসায়ী সক্রিয়। কাটআউট পদ্ধতিতে অস্ত্র সরবরাহ করায় অল্প সময়ে মূল ব্যবসায়ীদের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করাটাও দুরূহ হয়ে পড়ছে।

 

সূত্র আরো জানায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ গত তিন মাসে উদ্ধার করেছে ৭২টি আগ্নেয়াস্ত্র। তার মধ্যে ২৫টিই বিদেশি পিস্তল। ওই সময়ে পল্লবীতে সবচেয়ে বেশি ৬টি, মোহাম্মদপুরে ৪টি, উত্তরা পূর্ব থানা, ওয়ারী, কাফরুল, গেন্ডারিয়া, তুরাগ ও যাত্রাবাড়ী থানায় ৩টি করে অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। রাজধানীর ওই আট থানা এলাকাকে ডিএমপি রেডজোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ওসব এলাকার সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কারণ টার্গেট কিলিং, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াইকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে বেড়েই চলেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দেয়া হচ্ছে। তাতে জনমনে বিরাজ করছে আতঙ্ক।

 

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে বিগত তিন মাসে অস্ত্র আইনে ৫৯৭টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। আর বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সীমান্ত এলাকা থেকে ১৬টি রাইফেল, ৫টি রিভলবার ও ৯০টি পিস্তল জব্দ করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ১৪টি বিদেশি পিস্তল বিজিবি জব্দ করে। জানা যায়, বর্তমানে সীমান্তের পুরোনো রুটগুলো দিয়ে দেশে অস্ত্র প্রবেশ করার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উল্লেখ সংখ্যক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে পারছে। যশোরের বেনাপোল, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের খড়ের দ্বীপ, জাফলংয়ের কাটরি, সাতক্ষীরার কলারোয়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের অন্যতম পথ।

 

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুর অবস্থার সুযোগে দেশে ঢুকেছে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র। কিন্তু অবৈধ অস্ত্র ঠেকাতে পুলিশ এখনো সেভাবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। রাজনৈতিক মেরূকরণের সুযোগে অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। জিরো টলারেন্স নীতিতে চালান ঠেকানো না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।

 

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম জানান, অবৈধ অস্ত্রের চালান প্রতিরোধে পুলিশ বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। রাজধানীর যেসব এলাকায় সন্ত্রাসীদের বিচরণ বেশি, সেসব এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

একই প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও বহন রোধে পুলিশ সারা দেশেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অস্ত্রধারী ও সরবরাহকারী চক্র শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাড়ানো হয়েছে বিশেষ তদারকি।