দ্বিমুখী সংকটে শ্রমবাজার, প্রভাব পড়ছে সমাজ ও অর্থনীতিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখন এক দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। বিদেশি শ্রমবাজারে যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, আর দেশীয় শ্রমবাজারে বিনিয়োগ স্থবিরতা, শিল্প বন্ধ এবং ছাঁটাইয়ের কারণে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। এই দুই সংকট একসঙ্গে দেশের অর্থনীতি ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শ্রমবাজারে। ইরাককে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা, আকাশসীমা বন্ধ, ফ্লাইট বাতিল—সব মিলিয়ে প্রবাসীরা আটকে পড়ছেন। নতুন যারা কাজে যাবেন তাদেরও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন, এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই সৌদি আরবে। অর্থাৎ এককভাবে মধ্যপ্রাচ্যই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। এই বাজারে যুদ্ধের প্রভাব পড়ায় কর্মী পাঠানো ব্যাহত হচ্ছে, যা অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জানা যায়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে গত কয়েক সপ্তাহে হাজার খানেক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফলে যারা ভিসা হাতে পেয়েছেন তারা যেতে পারছেন না, অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। যারা ছুটিতে দেশে এসেছেন তারা ফিরতে পারছেন না। যারা ইতিমধ্যেই সেখানে কাজ করছেন তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব ভিসা ইস্যু কমিয়ে দিয়েছে, অনেক আবেদন বাতিল করেছে। নিয়োগকর্তাদের ভুয়া চাহিদাপত্র জমা দেওয়ার অভিযোগে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে নতুন কর্মীরা যেতে পারছেন না, যারা লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন তারা এখন বিপদে পড়েছেন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬০-৭০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। তাদের মধ্যে অনেকেই দৈনিক বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে কাজ করেন, মাসিক বেতন পান না। যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে তাদের কাজ কমে যাচ্ছে। এতে পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সবাই প্রভাবিত হবে। রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা না লাগলেও কর্মীদের আয় কমে যাবে, পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়বে। অন্যদিকে দেশীয় শ্রমবাজারেও সংকট বাড়ছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন কর্মসংস্থানে পুনরুদ্ধার হবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ছাঁটাই নিয়োগকে ছাড়িয়ে গেছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে, যা দেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস। এর ফলে শ্রমিকরা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এবং অনেকেই বাধ্য হয়ে নিম্নমানের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। শ্রমবাজারের বর্তমান চিত্রে দেখা যাচ্ছে, বেকারত্বের হার বেড়েছে এবং কর্মসংস্থান স্থানান্তরিত হচ্ছে নিম্নমানের অনানুষ্ঠানিক কাজে। অনেক শ্রমিক রিকশা, ছোটখাটো ব্যবসা বা অস্থায়ী কাজের দিকে ঝুঁকছেন। এতে আয় কমে যাচ্ছে এবং জীবনযাত্রার মানও নিচে নেমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণও কমছে, কারণ তারা কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাহীনতায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের দুর্বলতা। উচ্চ সুদহার, ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রমবাজারে সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রণোদনা বাড়াতে হবে, যাতে তারা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। তৃতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থিতিশীল নীতি ও অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। চতুর্থত, শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা চাকরি হারালে ন্যূনতম নিরাপত্তা পান। এদিকে, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক প্রভাবও ফেলছে। বেকারত্ব বাড়ায় তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে শ্রমবাজারের সংকট দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। বিদেশে কর্মী পাঠানো ব্যাহত হলে রেমিট্যান্স কমবে, দেশে কর্মসংস্থান সংকুচিত হলে বেকারত্ব বাড়বে। দুই দিকের সংকট মিলিয়ে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই বিকল্প বাজার খোঁজা, দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেছেন, নতুন বাজার ধরতে হবে। জাপান, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা চলছে। অভিবাসন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে।