নারায়ণগঞ্জে ভাড়া বাসা থেকে কুবি শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, স্বামী আটক

অনলাইন ডেস্ক:

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি ভাড়া বাসা থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফতুল্লার ভুঁইঘর এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও পরিবারের দাবি এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার স্বামী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলামকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

নিহত ফারজানা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের স্নাতকোত্তর ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে। দীর্ঘ প্রেমের সম্পর্কের পর তিন বছর আগে একই বিভাগের ২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলামকে বিয়ে করেন তিনি। নাজমুলের বাড়ি চাঁদপুরে। চাকরির সুবাদে গত আড়াই মাস ধরে তারা নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার ভুঁইঘর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।

ফারজানার বড় ভাই মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম জানান, তিন বছর আগে ভালোবেসে নাজমুলকে বিয়ে করেছিলেন তার বোন। বিয়ের সময় নাজমুল বেকার থাকায় প্রায় এক বছর তাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছিল ফারজানার পরিবার। পরবর্তীতে নাজমুলের চাকরি হলে পরিবারের পক্ষ থেকে সেই আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপরও বিভিন্ন সময় টাকার জন্য নাজমুল ফারজানার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন এবং তাকে মারধর করতেন বলে অভিযোগ করেন আরিফুল।

একপর্যায়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ফারজানা বাবার বাড়িতে চলে যান এবং সেখানে চার মাস অবস্থান করেন। তবে এই সময়ে নাজমুল তার কোনো খোঁজ নেননি। পরবর্তীতে পরিবারের পক্ষ থেকে নাজমুলের বিরুদ্ধে মামলা করা হলে, পারিবারিকভাবে সমঝোতার মাধ্যমে ফারজানাকে নিজের বাসায় ফিরিয়ে নেন নাজমুল এবং এরপর পরিবার মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়।

আরিফুল ইসলাম আরও জানান, গত ২৪ অক্টোবর নাজমুলের দুলাভাই তাকে ফোন করে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না, তা জানতে চান। তিনি মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করার পর ফারজানাকেও বিষয়টি জানান যে নাজমুলের দুলাভাই ফোন করেছিলেন। তখন ফারজানা তাকে বলেন, নাজমুল বাসায় ফিরলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন।

আরিফুলের ভাষ্যমতে, ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে তারা ফারজানার মুঠোফোন বন্ধ পান। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে নাজমুল তাকে ফোন করে জানান যে ফারজানা আত্মহত্যা করেছেন। তবে আরিফুলের দৃঢ় দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

বাড়ির মালিক আব্দুল কাদের বলেন, রাত সাড়ে ১০টার দিকে নাজমুল তাকে ডেকে জানায় যে তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে। এরপর তারা গিয়ে ফারজানাকে ফ্যানে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এর আগেও তিনি আরেকটি আত্মহত্যার মরদেহ নিজে নামিয়েছেন, কিন্তু সেই আত্মহত্যার সঙ্গে এই ঘটনার কোনো মিল পাননি। সাধারণত আত্মহত্যা করা মানুষের মধ্যে যেমন লক্ষণ থাকে, যেমন জিহ্বা ও চোখ বের হয়ে থাকা, এই মরদেহের ক্ষেত্রে তা দেখা যায়নি। পরবর্তীতে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

ফারজানার সহপাঠী নাজমুন নাহার বলেন, তাদের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কের ভিত্তিতে বিয়ে হওয়ায় কোনো সমস্যা তৈরি হলে সে বিষয়গুলো তারা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাইত না। আগামীকাল ফারজানার একটি প্রেজেন্টেশন রয়েছে এবং পরশুদিন তাদের মিডটার্ম পরীক্ষা চলছে। এছাড়া আগামী ১৫ নভেম্বর থেকে তাদের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষাও শুরু হওয়ার কথা ছিল।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) গাজী সুমন মাহতাব বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে ফারজানাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় তার স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে মনে হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। আমাদের তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।