নিজস্ব প্রতিবেদক:
দীর্ঘদিন শান্ত থাকার পর পূর্ব সুন্দরবনের বুক চিরে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে জলদস্যু ও বনদস্যুেদর নির্মম তাণ্ডব। এবার বনের শরণখোলা রেঞ্জের দুর্গম ‘ফুসফুসের চর’ সংলগ্ন সাগর মোহনা থেকে একটি মাছ ধরা ট্রলারসহ ১২ জেলেকে অপহরণ করেছে কুখ্যাত বনদস্যু ‘জাহাঙ্গীর বাহিনী’। মঙ্গলবার (১৯ মে) দিবাগত গভীর রাতে নিস্তব্ধ বনের মাঝে এই দুর্র্ধষ চড়াওয়ের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক শরণখোলার রাজাপুর এলাকার এক প্রবীণ মৎস্য ব্যবসায়ী (মহাজন) ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করে জানান, মঙ্গলবার রাতে জেলেরা যখন সাগর মোহনায় জাল ফেলে মাছ ধরছিলেন, ঠিক তখনই ১৫ থেকে ১৬ জনের একদল সশস্ত্র দস্যু আকস্মিকভাবে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দস্যুেদর পরনে ছিল বিশেষ এক ধরনের পোশাক এবং প্রত্যেকের হাতেই ছিল মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র। তারা জেলেদের মারধর করে একটি ট্রলারসহ ১২ জনকে জিম্মি করে সুন্দরবনের গহীন ও অজ্ঞাত কোনো আস্তানার দিকে নিয়ে যায় ওই ব্যবসায়ী আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া আরও বেশ কয়েকজন জেলেও বর্তমানে ওই দস্যু চক্রের কবলে অবরুদ্ধ রয়েছেন।
দস্যুেদর নির্মম শিকার হওয়া অপহৃত জেলেরা হলেন- বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রুহিতা এলাকার বাসিন্দা ইয়াসিন (২৫), মাসুম (৫৮), সেলিম (২৫), জাকির (২৮), হোসেন (৩০), তৌহিদ (২৮), ইয়াসিন (২০), মাহবুব (২৪), হানিফ (৩৫), হৃদয় (২৬), ইব্রাহিম (৪০) এবং সুমন (২৭)।
জেলেদের এই আকস্মিক অপহরণের খবরে উপকূলীয় মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর মাঝে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বরগুনা জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “পাথরঘাটার রুহিতা ও নিদ্রাসখিনা এলাকার ১২ জেলেকে বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনী সুন্দরবনের গহীন থেকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। আমরা দ্রুত তাদের অক্ষত উদ্ধার দাবি করছি।”
এদিকে ঘটনার খবর পাওয়ামাত্রই অপহৃত জেলেদের উদ্ধার এবং দস্যুেদর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে সর্বাত্মক অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের শেলারচর টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ফরেস্টার) মো. মিজানুর রহমান বুধবার দুপুরে গণমাধ্যমকে জানান, “মঙ্গলবার রাতেই ফুসফুসের চর এলাকায় ট্রলারসহ জেলে অপহরণের খবর আমাদের কাছে পৌঁছায়। খবর পাওয়ার পরপরই দস্যুেদর ধরতে এবং অপহৃতদের মুক্ত করতে বনরক্ষীদের একটি চৌকস দল সুন্দরবনের ভেতরে বিশেষ অভিযানে নেমেছে।” তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জিম্মি জেলেদের সুনির্দিষ্ট কোনো অবস্থান বা সন্ধান মেলেনি বলে জানান তিনি।
যোগাযোগ করা হলে শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শামিনুল হক জানান, “সুন্দরবনের জলসীমায় ১৭ জন জেলে অপহৃত হওয়ার একটি প্রাথমিক খবর আমরা পেয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত অপহৃত জেলেদের পরিবার বা কোনো মৎস্য ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে থানায় লিখিত কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। অভিযোগ পাওয়ামাত্রই আমরা আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কোস্ট গার্ড ও নৌ-পুলিশের সহায়তায় সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণস্পন্দন এই জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সুন্দরবনকে চিরতরে দস্যুমুক্ত রাখতে কোস্ট গার্ডের ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ ও বন বিভাগের এই যৌথ অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।











