নিজস্ব প্রতিবেদক:
১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও বাজারে তা মিলছে না, বরং গ্রাহকদের কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকায়, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫৬৩ টাকা বেশি। চাহিদামতো এলপিজি না পাওয়া এবং বাড়তি দাম গুনতে গিয়ে তীব্র ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির দাম এবং বোতলজাতকরণ, বিতরণ ও খুচরা বিক্রির চার্জ বা মুনাফা বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এক গুরুত্বপূর্ণ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) উদ্যোগে।
গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো এলপিজির দাম ও সরবরাহসংক্রান্ত সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি হলো বেশি দামে এলপিজি কিনতে বাধ্য হওয়ার কারণেই নির্ধারিত দামে তা বিক্রি করা সম্ভব হয় না। ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুযায়ী চার্জ বাড়ানোর এই নতুন উদ্যোগের পর থেকেই মূলত প্রশ্ন উঠেছে যে বাজারে কীভাবে এবং কবে নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়ার সমস্যার সমাধান হবে।
এর আগে গত ৪ অক্টোবর ১২ কেজি বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল বিইআরসি, যেখানে সেপ্টেম্বরে একই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা এবং পাশাপাশি যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বাড়িয়ে প্রতি লিটার ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
রামপুরা বাজারের একজন এলপিজি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন যে তারা চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না এবং বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না, আর পশ্চিম ধানমন্ডির তাকওয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক আরেক ব্যবসায়ী একই কথা জানিয়ে বলেছেন যে শুরু থেকেই তাদের বেশি দামে এলপিজি কিনতে হওয়ায় কম দামে বিক্রি করা তাদের পক্ষে অসম্ভব।
মানিকনগরের বাসিন্দা সোমা চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘এলপিজি যারা ব্যবহার করি, তাদের দোকানদার যে দাম বলে, সেই দামেই নিতে হয়। আমরা জিম্মি, উপায় নেই। অভিযোগ করব কাকে? আমরা যেহেতু বাধ্য, তাই যে দাম বলে, তাতেই কিনে আনি।’
একই ধরনের অভিযোগ জানিয়ে মালিবাগের বাসিন্দা রোকসানা আক্তার বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে এলপিজি ব্যবহার শুরু করেছিলাম। কিন্তু এখন দামের কারণে হিমশিম খাচ্ছি। আমাদের এই ভোগান্তি আসলেই কি কেউ দেখার নেই?’
বিইআরসির কাছে এলপিজির মূল্য কাঠামো পুনর্নির্ধারণের জন্য ইতিমধ্যেই সুনির্দিষ্ট আবেদন করেছে বেসরকারি কোম্পানি মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি, ডেল্টা এলপিজি, ওমেরা পেট্রোলিয়াম, পেট্রোম্যাক্স এবং এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)।
উক্ত আবেদনগুলোতে কোম্পানিগুলো তাদের পরিচালন ব্যয়, বোতলজাতকরণ, পরিবহন ও বিতরণ খরচ এবং এলপিজি আমদানির প্রিমিয়াম বৃদ্ধির কথা জোরালোভাবে উল্লেখ করে দাবি করেছে যে বিইআরসির নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় তাদের প্রকৃত ব্যয় অনেক বেশি, ফলে বিদ্যমান মূল্য কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী বোতলজাতকরণ চার্জ প্রতি কেজিতে ১৫ থেকে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে, ডিস্ট্রিবিউটরদের চার্জ প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৩ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ডিস্ট্রিবিউটররা প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারে তাদের চার্জ ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেছেন।
পাশাপাশি সরকারি এলপি গ্যাস কোম্পানির সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২৩৫ টাকা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এ বিষয়ে বলেছেন, ‘এই চার্জগুলো সবশেষ ২০২১ সালে অ্যাডজাস্ট করা হয়। এরপর মাঝে একবার ছোট করে অ্যাডজাস্ট করা হলেও তা খুব বেশি ছিল না। তাই এবার তাদের দাবি ছিল নতুন করে অ্যাডজাস্ট করা। এই অ্যাডজাস্ট করার জন্যই আমরা শুনানি করতে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই অ্যাডজাস্টের ফলে কিছু দাম বাড়তে পারে। তবে এলপিজির দাম নির্ধারণ হয় সৌদি সিপির (আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল কাঁচামাল প্রোপেন ও বিউটেনের দাম) ওপর নির্ধারণ করে। সেটি বাড়লে দাম বাড়ে। আর কমলে আমরাও কমিয়ে দিই।’
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি সেলিম খান মন্তব্য করেছেন, ‘আমাদের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মাসের শুরুতে বিইআরসি একটা দাম নির্ধারণ করে। এরপর কোম্পানিগুলো একবারের জায়গায় অনেক সময় মাসের মধ্যে দুইবারও দাম নির্ধারণ করে। এতে করে আমরা বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করি। আমাদের দাবি, কোম্পানিগুলো যেন বিইআরসির অনুমতি ছাড়া দাম নির্ধারণ করতে না পারে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘লাইসেন্সিরা যতবার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করে, ততবার দাম বাড়ানো হয়। আমরা যতবার শুনানিতে দাঁড়িয়ে দাম কমানোর প্রস্তাব করেছি, সে প্রস্তাব নেয়নি বিইআরসি। সব সময় ব্যবসায়ীদের দিকটাই দেখা হয়। শুনানিটা প্রহসনের মতো হয়ে গেছে। এদিকে বিইআরসি তাদের কথায় যে দাম বাড়ায়, সেটাও তারা আবার মানে না। বাজারে সেই দামে এলপিজি পাওয়া যায় না। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কোম্পানিগুলোর নাম পর্যন্ত বলে দিয়েছে, তাও সরকার কিছু করেনি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘ব্যবসায়ীরা যেসব প্রস্তাব দেয়, তার ন্যায্যতা আছে কি না, যৌক্তিক কি না, কিছুই দেখা হয় না। বিইআরসির আইনের স্পিরিটও ধারণ করতে পারছে না বিইআরসি। আইন অনুযায়ী, গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা, ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করা। যা গণশুনানিতে আসলে প্রতিফলিত হয় না। শুধু দাম বাড়ানোই যেন এই শুনানির কাজ।’
আরেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমতুল্লাহ জোরালোভাবে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা চান, সেই অনুযায়ী দামও বাড়ানো হয়। দেশে গ্রাহকদের আসলে দেখার কেউ নাই। এলপিজির দাম নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এখন পর্যন্ত এর সমাধান হয়নি। আর গ্রাহকদের সমস্যার সমাধান না করে খালি ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটরদের সুবিধা দেখে যাচ্ছে সরকার। আসলেই কি এলপিজির দাম এত বেশি হওয়া উচিত? এটাই সরকারের আগে খতিয়ে দেখা দরকার।’











