নিজস্ব প্রতিবেদক:
পাঁচ দফা দাবিতে টানা সপ্তম দিনের মতো সড়ক অবরোধ চলায় রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে পর্যটন ও যোগাযোগব্যবস্থা। পাহাড়ি এই জনপদে এখন কোনো পর্যটক না থাকায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগার। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও জরুরি ওষুধের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট দিনমজুর মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে।
সাজেক প্রশাসনিকভাবে রাঙামাটি জেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও এই বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্রটির পরিবহন, আবাসন, খাবার ও বিপণন ব্যবসার সঙ্গে খাগড়াছড়ির বহু মানুষ নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। ফলে সাজেকে চলমান এই অচলাবস্থার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে খাগড়াছড়ির স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের ওপরও।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য যানবাহন সমিতির নেতা আয়ুস কান্তি চাকমা জানান, সাজেক-দীঘিনালা-খাগড়াছড়ি সড়কে চলাচলকারী প্রায় সব যানবাহনই এই মুহূর্তে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে আছে। এর ফলে শত শত গাড়ির মালিক, চালক ও পরিবহন শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন এবং তাদের পরিবারগুলো অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সাজেকের সাধারণ বাসিন্দারাও দারুণ দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তাই সার্বিক মানবিক বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অবরোধ কর্মসূচি অবিলম্বে শিথিল বা স্থগিত করা উচিত।
একসময়ে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকা সাজেকের রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন দোকানপাট এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ ও ফাঁকা পড়ে আছে। পর্যটকদের যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ থাকায় পর্যটননির্ভর এসব ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িতদের সব ধরনের আয় একেবারে থেমে গেছে। অথচ দোকানভাড়া পরিশোধ, কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচের অর্থনৈতিক চাপ তাদের ওপর ঠিকই রয়ে গেছে। এমন অবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী এই অবরোধের কারণে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের বড় অংকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ মানুষের খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ এখন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকায় চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য এবং জীবনরক্ষাকারী জরুরি ওষুধের সরবরাহ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষের জোরালো আশঙ্কা, বর্তমানের এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে পাহাড়ি এলাকায় খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
সাজেকের স্থানীয় বাসিন্দা মিন্টি মালা এই প্রসঙ্গে বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যখন পুরোপুরি ব্যাহত হয়, তখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহের বিকল্প কোনো পথ বা ব্যবস্থা থাকে না বললেই চলে। অবরোধ কর্মসূচি আরও দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাবে। বিশেষ করে পরিবারে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দিলে ওষুধ সংগ্রহ করা এবং কোনো রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পরিবহন করা অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাজেকের চলমান এই গভীর সংকট নিরসনের লক্ষ্যে গত গত ২৬ অক্টোবর বাঘাইহাটের উজো বাজারে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সংসদ সদস্য, দুই জেলার জেলা প্রশাসক এবং অবরোধকারীদের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈঠকে আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের সমঝোতা বা ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। যার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে অবরোধ প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্তও আসেনি এই সভা থেকে।
এই বিষয়ে কটেজ মালিক যুবরাজ মিয়া জানান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির মাননীয় সংসদ সদস্যরা আন্দোলনরত পক্ষের সঙ্গে আলোচনার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছেন। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এখনও পর্যন্ত সামগ্রিক এই সংকটের কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান অর্জিত হয়নি।
অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের শীর্ষ নেতা বাবুধন চাকমা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা যেখানে সরাসরি হুমকির মুখে রয়েছে, সেখানে শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্র চালু রেখে লাভ কী হবে? তিনি অভিযোগ করেন যে, এই এলাকায় পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠার পর থেকেই স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের পৈত্রিক ভূমি হারিয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকে এখন বাধ্য হয়ে অন্যের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে তারা চাইলে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই সেখান থেকে সন্ত্রাসীদের সরিয়ে দিতে পারে। যদি প্রশাসন সেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবেই সাজেকবাসী তাদের এই অবরোধ তুলে নেবে বলে জানান তিনি।
সাজেকের চলমান এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় একদিকে যেমন পর্যটন ও পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত শত শত মানুষের আয়-রোজগার সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। অবিলম্বে বর্তমান এই সংকট নিরসন করে দ্রুত সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি পাহাড়ি জনপদে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় লোকজন।











