ভূমিসেবায় বড় পরিবর্তনের বার্তা, ‘অযথা অফিসে ঘুরতে হবে না’ বললেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ভূমিসেবা পেতে মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর ও দুর্নীতিমুক্ত ভূমি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এমন একটি ভূমি প্রশাসন গড়ে তোলা হচ্ছে যেখানে নাগরিকদের আর অযথা অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না এবং হয়রানির শিকারও হতে হবে না।

 

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবন এ তিন দিনব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে দেশের সব জেলা ও উপজেলায়ও একযোগে এই মেলা শুরু হয়েছে, যা চলবে ২১ মে পর্যন্ত।

 

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সেবা দেওয়া জনগণের প্রতি করুণা নয়, বরং জনগণের সেবা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব।” তিনি জানান, সরকার একটি “দুর্নীতিমুক্ত, হয়রানিমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা” প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা টেকসই উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

 

জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও মামলা বাড়ার পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, একসময় যে জমির মালিক ছিলেন একজন, সময়ের ব্যবধানে এখন সেই জমির মালিকানা অনেকের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে। ফলে মালিকানা, নামজারি, খতিয়ান, খাজনা কিংবা জমা-খারিজের মতো বিষয়গুলো আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

 

প্রধানমন্ত্রী জানান, ভূমি প্রশাসনের প্রায় সব সেবা এখন ধীরে ধীরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হচ্ছে। নাগরিকরা ঘরে বসেই অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, ই-নামজারি আবেদন, খতিয়ান সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবা নিতে পারছেন। যাঁরা নিজেরা অনলাইন ব্যবহার করতে পারেন না, তাঁদের জন্য চালু করা হয়েছে ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র।

 

তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে দেশের ৬১ জেলায় ৮৯৩টি ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু রয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ইউনিয়নে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি ‘ভূমি’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকদের হাতের মুঠোয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রযুক্তিনির্ভর ভূমি ব্যবস্থাপনা চালু হলে জমি নিয়ে বিরোধ কমবে এবং ভূমি অফিসে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও হ্রাস পাবে। তাঁর ভাষায়, “ভূমি-জমি ব্যবস্থাপনা যত বেশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা যায়, জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পথও তত সহজ হয়ে যায়।”

 

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে ৪৭ লাখের বেশি দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন, যার বড় অংশই জমিজমা সংক্রান্ত। এ পরিস্থিতিতে আদালতের বাইরে গ্রাম আদালত ও এডিআরের মতো বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার ওপর আরও জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

 

আলবার্ট আইনস্টাইনের উদ্ধৃতি টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শক্তি দিয়ে শান্তি রক্ষা করা যায় না, বোঝাপড়ার মাধ্যমেই এটি অর্জন করা সম্ভব।” তাঁর মতে, আলোচনা, সালিশ ও সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে মামলার জটও কমবে, আবার পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কও অটুট থাকবে।

 

মেলার উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্টল ও সেবাকেন্দ্র ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের তিনটি প্রকাশনার মোড়কও উন্মোচন করেন। এবারের মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, “জনবান্ধব স্বয়ংক্রিয় ভূমি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ ভূমি ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ”।

 

মেলায় ই-নামজারি আবেদন, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খতিয়ানের সত্যায়িত অনুলিপি সংগ্রহ, মৌজা ম্যাপ প্রাপ্তি এবং ভূমিসংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য জাতীয় হটলাইন ১৬১২২ ও বিভাগীয় হটলাইন ০১৭০৬৮৮৮৭৮৭ ব্যবহারে নাগরিকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।