অনলাইন ডেস্ক:
ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের থেনি জেলার একটি উপকারাগারে ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় বন্দি পালানোর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ১৭ বিচারাধীন বন্দিকে পুনরায় গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, আদালতের মাধ্যমে জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার তীব্র ক্ষোভ থেকেই এই বন্দিরা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কারাগার থেকে পালানোর সুদূরপ্রসারী ও দুঃসাহসিক পরিকল্পনাটি এঁকেছিলেন।
সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মূলত এই আকস্মিক পালানোর পরিকল্পনাটি করা হয় এবং পরবর্তীতে রাত ১০টার দিকে অত্যন্ত সুকৌশলে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
এই পুরো ঘটনার পেছনে মূল মাস্টারমাইন্ড বা পরিকল্পনাকারী হিসেবে মাদুরাইয়ের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী বিচারাধীন বন্দি লিঙ্গা প্রসাদকে চিহ্নিত করেছেন তদন্তকারীরা।
কারারক্ষীদের সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এক অভিনব চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতি তৈরির নিখুঁত পরামর্শ দিয়েছিল ওই বন্দি লিঙ্গা প্রসাদ।
পূর্বনির্ধারিত সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডাকাতির মামলায় অভিযুক্ত ২৬ বছর বয়সী অপর এক বন্দি মুথু ইলাঙ্গোভান হঠাৎ করেই মৃগীরোগের তীব্র খিঁচুনি উঠছে মর্মে অভিনয় শুরু করে, যা দেখে কারারক্ষীরা দ্রুত তাকে সহায়তা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
কারারক্ষীরা যখন খিঁচুনিতে আক্রান্ত বন্দির চারপাশে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক সেই মোক্ষম সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অন্য বন্দিরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হইচই শুরু করে দেন।
এ সময় তারা নিজেদের নির্দিষ্ট বন্দিশালা বা ব্লক থেকে বেরিয়ে এসে হাতের কাছে সুকৌশলে জোগাড় করা রান্নাঘরের বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে কর্তব্যরত কারারক্ষীদের ওপর আকস্মিক হামলা চালান।
পরবর্তীতে কারাগারের প্রধান প্রবেশপথের দায়িত্বে থাকা অন্য কারাকর্মীদেরও নিমিষেই কাবু করে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাবি ছিনিয়ে নেন এই বন্দিরা।
কারাগারের অভ্যন্তরে এই তাণ্ডব চালানোর পর বন্দিরা খুব সহজেই প্রধান গেট দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
দক্ষিণাঞ্চলের পুলিশ মহাপরিদর্শক বিজয়েন্দ্র বিদারি জানিয়েছেন যে, আটককৃত বন্দিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে থেনি কারাগার থেকে পালানোর এই ঘটনা সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ কর্মকর্তা বিজয়েন্দ্র বিদারি সংবাদমাধ্যমকে আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পালানোর পরিকল্পনাটি মূলত লিঙ্গা প্রসাদই করেছিলেন। তিনি শারীরিকভাবে আংশিক অক্ষম। সেদিন সন্ধ্যায় কয়েকজন বন্দি তাদের জামিনের আবেদন খারিজ হওয়া নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখনই লিঙ্গা প্রসাদ পালানোর প্রস্তাব দেন। অন্য বন্দিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই প্রস্তাবে রাজি হন বলে মনে হচ্ছে।’
তদন্তকারীদের সংগৃহীত তথ্য বলছে যে, মূল হোতা লিঙ্গা প্রসাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপরাধ, ছিনতাই, চোরাই মাল রাখা এবং তা হস্তান্তরসহ একাধিক গুরুতর মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
এছাড়া, ঘটনার দিন আদালতের মাধ্যমে জামিন লাভ করতে না পারায় আরও দুই বন্দি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
তদন্তকারীদের জোরালো ধারণা, ওই দুই বন্দির মধ্যকার এই তীব্র ক্ষোভও কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্তের উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
ঘটনাকালের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ উন্মোচন করতে এবং এই অপরাধে কার কার ঠিক কী ধরনের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল, তা বের করতে পালিয়ে যাওয়া ১৭ জন বন্দিকে একসঙ্গে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
যে বিশেষ ব্লক থেকে এই বন্দিরা পলায়ন করেছিলেন, সেখানে ঘটনার সময় মোট ৩২ জন বিচারাধীন বন্দি অবস্থান করছিলেন, যার মধ্যে ঠিক ১৭ জন বন্দি সফলভাবে পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন।
বাকি যেসব বন্দিরা সেসময় পালিয়ে যাননি, তারাও এই পুরো পলায়নকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ধরনের সহযোগিতা করেছিলেন কি না, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
প্রাথমিক তদন্ত শেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা হয়েছে যে, বন্দিদের এই জেল পালানোর পরিকল্পনাটি দীর্ঘমেয়াদী বা অনেক আগে থেকে তৈরি করা ছিল না।
বরং ঘটনার দিন সন্ধ্যায় নিজেদের মধ্যে ঘটে যাওয়া আকস্মিক আলোচনা ও হতাশার মধ্য দিয়েই মূলত এই হঠকারী পরিকল্পনাটি তরিঘরি করে তৈরি করা হয়েছিল।
বন্দিরা কীভাবে অত্যন্ত সুচারুভাবে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় সাধন করেছিলেন এবং কারাগারের প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থার নিখুঁত দুর্বলতাগুলো কীভাবে নিজেদের অনুকূলে কাজে লাগিয়েছিলেন, তা এখন গভীরভাবে তদন্ত করে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।










