মোহাম্মদপুরে ব্যবসায়ীকে আটকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি: ডিজিএফআই-আনসার সদস্যসহ ৬ জন কারাগারে

অনলাইন ডেস্ক:

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এক ব্যবসায়ীকে সুকৌশলে ফাঁদে ফেলে আটকে রেখে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, শারীরিক নির্যাতন ও অপহরণের গুরুতর অভিযোগে করা মামলায় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও বাংলাদেশ আনসার সদস্যসহ ছয়জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। রবিবার (২৫ অক্টোবর) রাতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রাসেল ইসলামের পক্ষ থেকে আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। পরবর্তী সময়ে আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মো. মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে এই আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন— ডিজিএফআই সদর দফতরের সার্জেন্ট আল মামুন (৩৯) ও ল্যান্স করপোরাল নুরুজ্জামান (৩১), আনসার সদস্য সোহেল রানা (৩২), বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান লগ এরিয়া সিকিউরিটি কোম্পানির নিরাপত্তাপ্রহরী মুকুল গাজী (২৬), নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার মাহফুজুর রহমান (২২) এবং লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের জিয়াউল ইসলাম (৩৫)।

মামলার এজাহার সূত্রে বিস্তারিত জানা যায় যে, এই ঘটনার বাদী মো. শরিফ (৩২) পেশায় একজন মোটরসাইকেল কেনাবেচা ব্যবসায়ী। প্রতিবেশী পরিচয়ে অভিযুক্ত জিয়াউল ইসলামের সঙ্গে তার পূর্বপরিচিতি ও সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে জিয়াউল একটি নতুন মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে শরিফকে কৌশলে মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা মডেল টাউনের রোড নম্বর ৬-এর ১৭ নম্বর বাসার ষষ্ঠ তলার একটি নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর জিয়াউল তাকে ঘরে রেখে জরুরি কাজের বাহানায় ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে দ্রুত বেরিয়ে যান।

এর ঠিক কিছুক্ষণ পরেই আল মামুন, নুরুজ্জামান, সোহেল রানা এবং মামলার অপর একজন অজ্ঞাতনামা আসামি ওই ফ্ল্যাটের ভেতরে প্রবেশ করে ব্যবসায়ী শরিফকে জিম্মি করে ফেলেন। এ সময় তার কাছে অত্যন্ত ভয়ভীতি দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। তাদের সেই সন্ত্রাসী কবল থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি পাওয়ার জন্য শরিফ তার সঙ্গে থাকা এবং মোটরসাইকেল কেনার উদ্দেশ্যে আনা ৭০ লাখ নয় বরং ৭০ হাজার টাকা তাদের দিতে বাধ্য হন। কিন্তু এতকিছুর পরও অভিযুক্তরা সন্তুষ্ট না হয়ে উল্টো তাকে বেধড়ক মারধর করেন এবং পুনরায় ১০ লাখ টাকা চাঁদা পরিশোধের জন্য কঠোর চাপ সৃষ্টি করেন বলে এজাহারে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে যে, চরম বিপদের মুখে পড়ে শরিফ তার পরিবারের সদস্যদের বারবার ফোন করে যেকোনো উপায়ে টাকা জোগাড় করার মরিয়া চেষ্টা চালান। এরপর গত ২৫ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৩টার দিকে অভিযুক্তদের মধ্য থেকে তিনজন তাকে জোরপূর্বক ওই ফ্ল্যাট থেকে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসেন। পরে নিচে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা মুকুল গাজীর দায়িত্বে থাকা একটি সাদা রঙের টয়োটা প্রোবক্স গাড়িতে তাকে তুলে নেওয়া হয়। গাড়িটি তখন চালাচ্ছিলেন মামলার অন্যতম অভিযুক্ত মাহফুজুর রহমান। পরবর্তীতে তাকে সেখান থেকে সোজা শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের বিপরীত পাশের একটি স্থানে নিয়ে পুনরায় আটকে রাখা হয়।

ঘটনার একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে চা খেতে গেলে ভুক্তভোগী শরিফ রাস্তার পাশে পুলিশের একটি গাড়ি দেখতে পান। এই মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া না করে তিনি দ্রুত চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে সড়কে নেমে আসেন এবং জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশকে পুরো ঘটনা বিস্তারিত জানান। এর ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অভিযুক্ত পাঁচজনকে আটক করে। এরপর খবর পেয়ে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশও সেখানে পৌঁছে তাদের নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং অপরাধে ব্যবহৃত সাদা রঙের টয়োটা প্রোবক্স গাড়িটি জব্দ করে থানায় নিয়ে আসে।

ঘটনার পর ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী শরিফ নিজে বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দেওয়া লিখিত আবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই চাঞ্চল্যকর মামলার মূল তদন্ত সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত আসামিদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে আটকে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট সবার যুক্তিতর্ক ও আবেদন পর্যালোচনা করে আদালত শেষ পর্যন্ত তাদের কারাগারে পাঠানোর এই নির্দেশ দেন।

এদিকে আলোচিত এই মামলায় শুধুমাত্র বর্তমানের আটক ছয়জনই নয়, বরং এর বাইরেও সোনিয়া (৩০) ও ফনিরুল ওরফে মনিরুল (৪৫) নামের আরও দুজনকে সুনির্দিষ্টভাবে আসামি করা হয়েছে, যাদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।