রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ের নথি উচ্চ আদালতে, ডেথ রেফারেন্স পাঠাল ট্রাইব্যুনাল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর পল্লবীর আলোচিত শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের রায়ের পূর্ণাঙ্গ নথি উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছে। আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (৯ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে ডেথ রেফারেন্সসহ মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়।

 

আদালত সূত্র জানায়, ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের স্বাক্ষরের পর ৬৯ পৃষ্ঠার রায়ের কপি এবং তিন পৃষ্ঠার ডেথ রেফারেন্সসহ মোট ৭২ পৃষ্ঠার নথি উচ্চ আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হয়েছে। বিকেলে মামলার কেস ডকেট হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছায়।

 

এর আগে রোববার (৭ জুন) বহুল আলোচিত এ মামলার রায়ে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। একই সঙ্গে সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়। আদালত নির্দেশ দেন, অর্থদণ্ড আদায় না হলে আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে ভুক্তভোগী রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

 

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, হত্যার আগে শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রধান আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের কোনো আবেদন না থাকায় আদালত সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেন। একই সঙ্গে স্বামীকে পালাতে সহযোগিতা এবং অপরাধ প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা না রাখার কারণে স্বপ্নার সম্পৃক্ততাও প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

 

রায়ের পর আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি করলে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল নিষ্পত্তির পর তিন মাসের মধ্যেই রায় কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে। তার ভাষায়, “আমার প্রত্যাশা, আগামী তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব, যদি সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ এটাকে প্রায়োরিটি দিয়ে শুনানি করেন।”

 

গত ১৯ মে পল্লবীর একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং মরদেহ গোপনের চেষ্টা চালানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্নাকে আটক করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

 

ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তদন্ত কর্মকর্তা মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণা করা হয়।

 

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক মাসরুর সালেকীন বলেন, “শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এই মামলাটি কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়। এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা।”

 

তিনি আরও বলেন, “শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কোনো শিশু যখন যৌন নির্যাতন বা হত্যার মতো অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজকে আহত করে।”

 

ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে মামলাটি এখন উচ্চ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করল। আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।