অনলাইন ডেস্ক
বিশ্ব রাজনীতির টানটান উত্তেজনার কেন্দ্রে এখন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা প্রশমিত করতে আজ শনিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মুখোমুখি আলোচনায় বসছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা। মূলত গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের সম্মতিতে হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী রূপ দিতেই এই কূটনৈতিক তৎপরতা।
আলোচনাকে সামনে রেখে ইসলামাবাদের ‘রেড জোন’ এলাকাটি কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। বৈঠকের মূল কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সেরেনা হোটেল’। হোটেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সরকারি বাহিনী এবং সাধারণ পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার খাতিরে রাজধানীজুড়ে ৯ ও ১০ এপ্রিল সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল এবং প্রবেশপথগুলো সিল করে দেওয়া হয়েছে। পুরো বিশ্ব এখন এই হোটেলের আলোচনার কক্ষগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, যার সাথে আছেন ডনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই আলোচনার আনুষ্ঠানিক আয়োজক এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবেন।
আলোচনার মূল চ্যালেঞ্জ ও অমিল
বৈঠকটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন দুপক্ষের অবস্থানে ব্যাপক ব্যবধান বিদ্যমান। ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য হলো—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা আনা এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া। অন্যদিকে, ইরান ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং তাদের মিত্র দেশগুলোতে সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
বর্তমান আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবানন। ইরান চাচ্ছে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তারা আলোচনা থেকে সরে আসতে পারেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিনিধি জে ডি ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। এই আস্থার সংকট এবং ইসরায়েলের অনুপস্থিতি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় দেশের সঙ্গেই কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখায় পাকিস্তান এখন প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা এই বৈঠকের পথ সুগম করেছে। এছাড়া পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি না থাকা এবং বড় শিয়া জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ইরানের কাছে ইসলামাবাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ দিনব্যাপী এই আলোচনা দীর্ঘ ও জটিল হবে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসার সম্ভাবনা কম, তবে দুই পক্ষ সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসাকেই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি এই আলোচনার মাধ্যমে অন্তত আস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফেরার পথে বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।











