নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর ‘চপেটাঘাত’ বলে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ধ্বংস করা হয়েছে এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির এ বক্তব্য তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার-মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
এই পরিস্থিতির পটভূমি দীর্ঘদিনের। ১৯৯৯ সালে মাজদার হোসেন মামলায় উচ্চ আদালতের ১২ দফা নির্দেশনার পর ২০০৭ সালে বিচার বিভাগকে প্রথমবারের মতো ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে পৃথক করা হয়। এরপর বিচারক নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন করা হয় এবং বিচারকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। তবে বিচারকদের ছুটি, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণেই থেকে যায়।
পরিস্থিতির পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালে। জামায়াতের দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ রায় দেন এবং ৯০ দিনের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর ২০২৫ সরকার অধ্যাদেশ জারি করে এবং ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। সেখানে ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাও নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে চলতি বছরের ৭ এপ্রিল হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ১০ এপ্রিল সরকার সেই অধ্যাদেশ বাতিল ঘোষণা করে। এর প্রতিবাদে জামায়াত ১৯ এপ্রিল নতুন রিট পিটিশন দায়ের করে এবং ৫ মে আদালত অবমাননার নোটিশ জারি করে। এরপর ১৯ মে বিচার বিভাগের সিনিয়র সচিবসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়।
শিশির মনির বলেন, “বিচার বিভাগ স্বাধীন হলে রায় যার পক্ষেই যাক না কেন, তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বিচারকদের বদলি করে দেবো, পদোন্নতি দেবো না, সুন্দরবন-বান্দরবান বদলি করে দেবো, এটি স্বাধীন বিচার বিভাগের চরিত্র হতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, “আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে বদলি, ছুটি ও পদোন্নতির ক্ষমতা থাকলে অধঃস্তন আদালতের বিচারকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। এ সবকিছু সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের কাছে থাকা উচিত।”
প্রধান বিচারপতির বাজেট অনুমোদনের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে। শিশির মনির বলেন, বাংলাদেশে প্রতি ৭৮ হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন বিচারক রয়েছেন, যা পৃথিবীতে বিরল। সুপ্রিম কোর্ট বিচারক বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, কিন্তু সেই ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “ফ্যাসিবাদের নতুন খেলা খেলছে সরকার। বিচার বিভাগকে হস্তগত করতে বিগত সরকার যে উদাহরণ তৈরি করেছিল, বর্তমান সরকারও সেটির পুনরাবৃত্তি করছে।”
শিশির মনির বলেন, “জুলাই সনদে স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিতের কথা বলে এখন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা জাতির সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গের সামিল।” তিনি জানান, স্বাধীন বিচার বিভাগ বিএনপিসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী সব দলের চাহিদা ছিল, কিন্তু সরকার সচিবালয় বিলুপ্ত করে সেই চাহিদার অপমৃত্যু ঘটিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার-মিডিয়া সম্পাদক মু. আতাউর রহমান সরকার।











