বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে আপত্তি, গণশুনানিতে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে অংশীজনরা ভোক্তাদের ওপর নতুন আর্থিক চাপ না দিয়ে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমানোর পথ খোঁজার দাবি জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২১ মে) অনুষ্ঠিত এ শুনানিতে বক্তারা বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস, প্রকল্প ব্যয় ও অদক্ষতার দায় সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপানো উচিত নয়।

 

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শুনানিতে পিডিবি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ডিপিডিসি, ডেসকো, ওজোপাডিকো ও নেসকো তাদের খুচরা ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব তুলে ধরে। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির উপস্থাপনায় বলা হয়, ছয় বিতরণ সংস্থা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বিতরণ ব্যয় ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে।

 

কমিটির হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছয় সংস্থা ও কোম্পানির মোট নিট বিতরণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা। এ সময়ে বিদ্যুৎ বিক্রির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯৫ হাজার ৬১৩ মিলিয়ন ইউনিট। এছাড়া ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ৯৮ লাখ ছাড়াবে বলেও জানানো হয়।

 

শুনানিতে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, “দিন শেষে এটা টাকা পয়সার হিসাব। তাই হিসাব উপস্থাপনের সময় কোটি আর মিলিয়ন একসঙ্গে ব্যবহার না করাই ভালো।” তিনি বিদ্যুতের দামের সঙ্গে রেট অব রিটার্ন ও করপোরেট ট্যাক্স যুক্ত করারও বিরোধিতা করেন। তার ভাষায়, “রাষ্ট্রের মনোপলি সেবা কস্ট টু কস্ট হওয়া উচিত, কস্ট প্লাস নয়।”

 

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বদলে কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়ে গণশুনানি হওয়া দরকার।” তিনি নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দেওয়ার প্রস্তাবও দেন। একই সঙ্গে লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য নতুন স্ল্যাব প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলেন, “এটা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেট কাটার নতুন ব্যবস্থা।”

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, শুধু দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা দেখালেই হবে না, বিদ্যুতের দাম কমানোর পরিকল্পনাও থাকতে হবে। তিনি আইপিপি ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে বলেন, অতিরিক্ত সক্ষমতার জন্য বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জেবউননেসা বলেন, “দুর্নীতি, অদক্ষতা ও প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে না পারলে শুধু ট্যারিফ বাড়িয়ে সংকটের সমাধান হবে না।” তার মতে, বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতির পেছনের কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

 

শিল্পখাত থেকেও আসে নানা আপত্তি। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বড় শিল্প গ্রাহকরা নিজেদের অর্থায়নে সাবস্টেশন ও সংযোগ অবকাঠামো তৈরি করেছেন। তাই তাদের ওপর সিস্টেম লস বা অতিরিক্ত ডিমান্ড চার্জ চাপানো উচিত নয়। তিনি বলেন, “অবকাঠামো আমরা নির্মাণ করেছি। তারপরও প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ দিতে হচ্ছে। এই ডিমান্ড চার্জ থেকে আমরা রেহাই চাই।”

 

শুনানিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গও উঠে আসে। জ্বালানি খাতের পর্যবেক্ষক শুভ কিবরিয়া বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। তিনি বলেন, “সরকার একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য বলছে, আর বিতরণ কোম্পানিগুলো অন্যদিকে নেট মিটারিংকে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা হিসেবে দেখছে।”

 

গণশুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিভিন্ন পক্ষের মতামত, তথ্য ও পর্যবেক্ষণ কমিশন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। তিনি জানান, ২৩ মে ২০২৬ পর্যন্ত লিখিত মতামত জমা দেওয়া যাবে।

 

ক্যাপাসিটি চার্জ প্রসঙ্গে জালাল আহমেদ বলেন, “ক্যাপাসিটি চার্জের জন্য ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে জাতির জন্য ক্ষতিকর কাজ হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেল খাতের বড় প্রকল্প কমিশনের মতামত ছাড়া পরিকল্পনা পর্যায়ে নেওয়া যাবে না।