নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের নৌপথকে নিরাপদ করতে প্রথমবারের মতো নৌযান শুমারির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাথমিক হিসেবে দেশে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬০টি ইঞ্জিনচালিত নৌযান পাওয়া গেছে। তার মধ্যে ঘাটভিত্তিক নৌযান ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৪৪টি এবং অন্যভাবে তালিকাভুক্ত ৭০ হাজার ৭১৬টি নৌযান। আর দুর্গম এলাকায় কিছু নৌযানের তথ্য এখনো তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্তির কাজ চলছে। কিন্তু বাস্তবে দেশের নৌপথে নিবন্ধিত নৌযানের অনেক বেশি নৌযান চলাচল করছে। যা প্রতিনিয়ত দেশের নৌপথকে অনিরাপদ করে তুলছে। বিগত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ২০ হাজার ৫৫২টি নিবন্ধিত নৌযান ছিলো। আর শুমারিতে পাওয়া ইঞ্জিনচালিত নৌযানের সংখ্যা নিবন্ধিত নৌযানের চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি। অর্থাৎ দেশের নৌপথে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক নৌযান চললেও কার্যত সরকারি তদারকির বাইরে ওসব নৌযানের বড় অংশ। নৌপরিবহন অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে. নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রকল্পের আওতায় দেশে প্রথমবারের মতো বিবিএস নৌযান শুমারি শুরু করে। চলতি বছরের ৪ থেকে ১৭ মে দেশব্যাপী নৌযান তালিকাভুক্তি কার্যক্রম শুরু হয়। শুমারিতে প্রতিটি নৌঘাটের জিপিএস অবস্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে। সেজন্য মাঠপর্যায়ে ১ হাজার ২৯৩ জন তথ্যসংগ্রহকারী কাজ করে। আর উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের শুমারি সমন্বয়কারীরা তাদের কাজ তদারকি করে। নৌযান শুমারির লক্ষ্য হলো দেশের সমুদ্রগামী, উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ ইঞ্জিনচালিত নৌযানের তথ্য সংগ্রহ করে একটি আধুনিক ‘ন্যাশনাল শিপস অ্যান্ড মেকানাইজড বোট ডেটাবেজ’ তৈরি করা। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত আর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা। এই শুমারি অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন নৌযান শনাক্ত, দুর্ঘটনা হ্রাস এবং নৌপরিবহন খাতে পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র জানায়, নৌপথের প্রায় ২৫ ধরনের নৌযানের তথ্য নৌশুমারিতে পাওয়া গেছে। তার মধ্যে আছে কার্গো, বাল্কহেড, যাত্রীবাহী লঞ্চ, স্পিডবোট, ট্রলার, ড্রেজার, ফেরি ও প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ইঞ্জিনচালিত নৌযান। একই নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ, বালুবাহী বাল্কহেড, মাছ ধরার ট্রলার, ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ফেরি চলাচল করে। কিন্তু এক নয় সবার গতি, আকার, চালকের দক্ষতা, নকশা ও নিরাপত্তা মান। বিগত ১৯৯১ সাল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অভ্যন—রীণ নৌপথে ৬৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওসব দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৮৮১ জন নিহত এবং ৭০৫ জন আহত হয়। আর এবং নিখোঁজ থাকে ৫০৫ জন। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযান ২৫২টি, মালবাহী নৌযান ১৮০টি এবং অন্যান্য ২০৯টি নৌযান ছিল। সামপ্রতিক বছরেও নৌপথ নিরাপদ হয়নি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ১৩২টি নৌ দুর্ঘটনায় ১৪৯ জন নিহত, ১২৩ জন আহত এবং ৩৪ জন নিখোঁজ হয়েছে।
এদিকে নৌপথ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশনদীমাতৃক দেশ। এদেশে নৌপথকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সড়কের চাপ কমানো, পণ্য পরিবহন সাশ্রয়ী করা এবং উপকূল-হাওর-চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নৌপথের বিকল্প কম। কিন্তু নিরাপত্তাহীন দেশের নৌপথ। এখন সরকার প্রথমবারের মতো দেশের নৌপথে বাস্তবে কত নৌযান রয়েছে তার ডেটাবেইস করে প্রতিটি নৌযানকে নিবন্ধন, সার্ভে, ফিটনেস, চালকের সনদ, রুট অনুমতি ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে বাল্কহেড, ড্রেজার, স্পিডবোট ও যাত্রীবাহী নৌযানের ক্ষেত্রে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি দরকার। কারণ নৌপথকে আরো দক্ষ ও নিরাপদ করতে অনিবন্ধিত নৌযানগুলোর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ এবং সেগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা জরুরি। তাহলেই নৌপথ যাতায়াত ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কারণ নৌযানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা গেলে সেগুলোকে আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। ফলে নৌযানগুলোর নিয়মিত সার্ভে করা এবং মাস্টার বা চালকদের যথাযথ যোগ্যতা, ট্রেনিং ও সার্টিফিকেট আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা ও মনিটরিং করা সম্ভব হবে।
অন্যদিগকে নৌযান শুমারির সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা মো. আরিফ হোসেন এ বিষয়ে জানান, বর্তমানে কেবল ইঞ্চিনচালিত নৌযানের প্রাথমিক তালিকা করা হচ্ছে। চলতি বছরের আগস্ট মাস থেকে ওসব নৌযানের বিস্তারিত তথ্য তথা ইঞ্জিনচালিত নৌযানের ক্যাটাগরি (ধরন), ইঞ্জিনের সক্ষমতা, নৌযানে নিয়োজিত জনবলের তথ্য, কোন রুটে কত নৌযান চলছে ওসবের বিস্তারিত শুমারি শুরু হবে । ওই শুমারি শেষ হলে ইঞ্জিনচালিত নৌযানের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।











