লালমনিরহাটে শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার, রণক্ষেত্র ফলিমারী, এসপিসহ আহত ১৬

জেলা প্রতিনিধি:

‎লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় নিখোঁজের পরদিন নন্দিনী রায় (৭) নামে এক শিশুর বস্তাবন্দি ও মাটিচাপা দেওয়া মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রাম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে।

 

‎উত্তেজিত জনতার হামলায় জেলা পুলিশ সুপার (এসপি), পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকসহ অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। ভাঙচুর করা হয়েছে ডিসি, পুলিশ সুপার ও সাংবাদিকের গাড়িসহ অন্তত ১০টি যানবাহন।

 

‎এদিকে, নিখোঁজের পর রাতে থানায় সাধারণ ডায়েরি না নিয়ে পরিবারকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হককে তাৎক্ষণিকভাবে ক্লোজড করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে প্রধান অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র (১৮) ও রঞ্জিত কুমার রায় (৩০)কে আটক করেছে পুলিশ।

 

‎নিহত নন্দিনী রায় ফলিমারী গ্রামের নলিনী কান্তের মেয়ে। সোমবার দুপুর থেকে সে নিখোঁজ ছিল।

 

‎পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয় শিশু নন্দিনী। স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে তার সন্ধান না পেয়ে সোমবার রাতেই আদিতমারী থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করতে যান। কিন্তু থানার ওসি নাজমুল হক তা গ্রহণ না করে পরিবারকেই খোঁজাখুঁজি করার পরামর্শ দিয়ে ফিরিয়ে দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

 

‎মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টা ক্ষেতে নতুন নরম মাটি দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে সেখানে মাটি খুঁড়ে নন্দিনীর বস্তাবন্দি লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

 

‎নিখোঁজের রাতে জিডি না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন জেলা পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান। কর্তব্যরত অবস্থায় অবহেলা ও গাফিলতির দায়ে তিনি আদিতমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজমুল হককে তাৎক্ষণিকভাবে থানা থেকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করার আদেশ দেন।

 

‎নন্দিনীর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় আগুন জ্বলে ওঠে। বিক্ষুব্ধ জনতা প্রতিবেশী রঞ্জিত চন্দ্রের ছেলে প্রধান অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এতে বাড়িটির কয়েকটি ঘর মালামালসহ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

 

‎দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে ঘটনাস্থলে যান। এ সময় উত্তেজিত জনতা আরও উগ্র রূপ ধারণ করে আচমকা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ব্যাপক টিয়ারশেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

 

‎ঘণ্টাব্যাপী চলা এই দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান, বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকসহ অন্তত ১৬ জন আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালে উত্তেজিত জনতা পুলিশ ও সাংবাদিকদের গাড়িসহ অন্তত ১০টি যানবাহন ভাঙচুর করে লণ্ডভণ্ড করে দেয়।

 

‎পরিস্থিতি মোকাবিলা করে পুলিশ এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে দুইজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে একজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, তিনি হলেন প্রতিবেশী বিধান চন্দ্র (২৩) ও রঞ্জিত কুমার রায় (৩০)।

 

‎বিপুল পরিমাণ পুলিশ ও বিজিবি সদস্য মোতায়েনের পর বর্তমানে ফলিমারী গ্রামের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরো এলাকায় চরম থমথমে অবস্থা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে অনেক বাড়িঘর।

 

‎অন্যদিকে, অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে গিয়ে অবরুদ্ধ হওয়া, সরকারি কাজে বাধা দান এবং পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর পরিকল্পিত হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে পুলিশে। এই হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টির অভিযোগে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।

 

‎লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ করতে পুলিশ সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করে কাজ করেছে। পুলিশের ওপর হামলা এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে অপরাধী যে-ই হোক, শিশু হত্যাকাণ্ড এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে কাজ করছে পুলিশ।