সুইজারল্যান্ডে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, স্থায়ী চুক্তির আশায় শুরু উচ্চপর্যায়ের আলোচনা

অনলাইন ডেস্ক:

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা, লেবানন সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তার মধ্যেই সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধ নিরসন এবং একটি সম্ভাব্য স্থায়ী সমঝোতার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

রোববার (২১ জুন) সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে শুরু হওয়া এ আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলে রয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং শীর্ষ নিরাপত্তা, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা। রয়টার্স ও এএফপি জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।

 

কয়েকদিন আগে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে পৌঁছানোর পর এ আলোচনা শুরু হলো। ওই সমঝোতায় আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির রূপরেখা তৈরির কথা রয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

 

তবে আলোচনার শুরুতেই নতুন করে জটিলতা তৈরি করেছে হরমুজ প্রণালি ইস্যু। রয়টার্স বলছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হওয়ায় ইরান আবারও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, জলপথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

 

আলোচনায় যোগ দেওয়ার আগে জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, “পারমাণবিক ইস্যু এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি বিষয়ে আমরা অগ্রগতি দেখতে চাই।” তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নই এখন প্রধান লক্ষ্য।

 

এদিকে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে একটি “সমগ্র ও স্থায়ী চুক্তি” অর্জনের আশা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে চূড়ান্ত চুক্তির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে কাজ করার জন্য বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত ও বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে একটি ফলোআপ গ্রুপও কাজ করবে।

 

আলোচনার আগে সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইগনাজিও ক্যাসিসের সঙ্গে বৈঠক করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈঠকের ছবি প্রকাশ করেন তিনি। ক্যাসিস বলেন, “চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতেও সুইজারল্যান্ড ও ইরানের মধ্যে একটি বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এই সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।”

 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমেইল বাঘায়ি জানিয়েছেন, তেহরান আলোচনায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি দেখতে চায়। বিশেষ করে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং ইরানের অর্থনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে।

 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর ঘোষিত যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। এমনকি ইসরায়েলে পরিচালিত এক জরিপে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান তুলনামূলকভাবে বেশি কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে।

 

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সুইজারল্যান্ডের এই বৈঠক শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আলোচনার ফলাফল হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ, জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপথে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

 

সূত্র: রয়টার্স, এএফপি, আল জাজিরা